Category Archives: JAL-Hadiths

একটি জাল তাফসীর

কেউ জাল হাদীস মানে আবার কেউ সহীহ হাদীস মানে দাবী করলেও জাল তাফসীর মানে। যেমন: একটি জাল তাফসীর হলো: “তোমাদের উপর জামাআতী যিন্দেগী ফরয করা হল।” জামাআতী যিন্দেগী মানে কি? নতুন করে দল তৈরী করে দলাদলী করা অথচ কুরআনে দলাদলী নিষেধ করা হয়েছে। জামাআত শব্দের বাংলা কি জামাআতী, সঠিক বাংলা শব্দ কি? যিন্দেগী শব্দ কোথা থেকে আসলো? যিন্দেগী শব্দের বাংলা কি? ফরয শব্দ কোথা থেকে আসলো? ইহা ১০০% জাল তাফসীর তাতে কোন সন্দেহ নাই। তাহলে সঠিক অনুবাদ কি?
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ ، وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ
“তোমরা জামাআত (ঐক্য) আকড়ে ধরে থাকবে এবং দলাদলি বা বিচ্ছিন্নতা থেকে সাবধান থাকবে।”
কিংবা অনুবাদ হতে পারে;
“তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকবে আর সাবধান, দলে দলে বিভক্ত হয়ো না।” (তিরমিযী হা/২৪৬৫)।

আল্লাহ বলেন,
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَّلاَ تَفَرَّقُوا
‘তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ করো এবং তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (আলে ইমরান ৩/১০৩)।
নু‘মান বিন বাশীর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেন,
الْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ
‘ঐক্য রহমত এবং বিচ্ছিন্নতা আযাব’। (আহমাদ হা/১৮৪৭২; ছহীহাহ হা/৬৬৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৩১০৯)


comments-

মোহাম্মদ সাইদুর রহমানহাদীসটি হলো: নু‘মান বিন বাশীর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেন,
الْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ
‘ঐক্য রহমত এবং বিচ্ছিন্নতা আযাব’। (আহমাদ হা/১৮৪৭২; ছহীহাহ হা/৬৬৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৩১০৯)

 

hands up-down of naval“আল-মুছান্নাফ” ইবনে আবী শায়বাহ’র মধ্যে বিকৃতি: তাহক্বীক্ব এবং তানক্বীদ

প্রবন্ধ : “আল-মুছান্নাফ” ইবনে আবী শায়বাহ’র মধ্যে বিকৃতি
(শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামার দুঃসাহস)
তাহক্বীক্ব এবং তানক্বীদ : আবুল বাদ্র মাওলানা ইরশাদুল হক্ব আছারী (ফায়ছালাবাদ)
@প্রথম পরিচ্ছেদ@
‘মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ’ গ্রন্থে হযরত ওয়ায়েল বিন হুজর-এর হাদীছ ছলাতে হাত বাঁধার বরাত নিয়ে দীর্ঘ দিন হ’তে আলোচনার বিষয় বস্তু বনে গিয়েছে যে, এতে ‘নাভীর নীচে’ শব্দাবলী আছে নাকি নেই? ‘আল-মুছান্নাফ’ গ্রন্থটির প্রথম ভলিউমটি সর্ব প্রথম হিন্দুস্তানের ‘মাওলানা আবুল কালাম একাডেমী হায়দারাবাদ’ হ’তে ১৩৮৬ হিজরী মোতাবেক ১৯৬৬ইং এর মাঝে প্রকাশিত হয়েছিল। তার মধ্যে (১/৩৯০) এই হাদীছটি রয়েছে। কিন্তু তাতে ‘নাভীর নীচে’ শব্দাবলী নেই। তার ফটোকপি দু’বার ‘আদ-দারুস সালাফিইয়া মুম্বাই’ হ’তে মুদ্রিত হয়েছিল। কিন্তু এই কপিকেই যখন ‘ইদারাতুল কুরআন করাচী’ -এর পরিচালকগণ যখন প্রকাশ করলেন তখন তাতে পুরো পৃষ্ঠার শব্দাবলীর বিপরীতে স্পষ্ট হরফ দ্বারা ‘তাহতাস সুর্রাহ’ (নাভীর নীচে) শব্দ দু’টি সংযোজন করে দিয়েছেন। যা প্রতিটি মানুষই স্বচক্ষে দেখতে পারেন।
এরপর ‘ত্বাইয়েব একাডেমী মুলতান’ এবং ‘মাকতাবাহ ইমদাদিয়া মুলতান’ -এর পরিচালকগণ উস্তাদ ‘সাঈদ আল-লিহাম’ -এর তাহক্বীক্বসহ মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহর কপি প্রকাশ করেছিলেন। আর তারাও নিজেদের পক্ষ হ’তে ‘নাভীর নীচে’ (শব্দদ্বয়) সংযোজন করে দিয়েছেন। অসততা এবং বিকৃতির শেষ দেখুন যে, উস্তাদ সাঈদ আল-লিহামের তাহক্বীক্বে এই কপিটিই এর পূর্বে ‘দারুল ফিকর বৈরূত’ প্রকাশ করেছিল; কিন্তু তাতে এই সংযোজনটি আদৌ নেই। ‘আরবাবে ত্বাইয়েব একাডেমী’ ‘মাকতাবা রাশিদিইয়া পীরাফ ঝান্ডা সিন্ধ’ -এর লিখিত কপি মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহর (বিষয়বস্তুর সাথে) সম্পৃক্ত পৃষ্ঠায় যে লজ্জাজনক বিকৃতি করে তার ছবি (ফটোকপি) প্রকাশ করেছিল তা ‘অন্ধকারের উপর অন্ধকার’ -এর সত্যায়ন হয়েছে। আল্লাহর নিকটেই অভিযোগ রইল।
আর এখন বর্তমানে ১৪২৭ হিজরী মোতাবেক ২০০৬ইং ‘মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ’র একটি সংস্করণ শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামার তাহক্বীক্বে ‘দারুল ক্বিবলাহ মুয়াস্সাতু উলূমিল কুরআন’ হ’তে প্রকাশিত হয়েছে। আর তাতেও ‘নাভীর নীচে’ -এর সংযোজন করে দেয়া হয়েছে। ‘ইদারাতুল কুরআন করাচী’র এই পদক্ষেপ গ্রহণ তো সরাসরি চুরি এবং বল প্রয়োগের সত্যায়ন। কোন্ নুসখার (কপি) ভিত্তিতে তারা এই সাহস করলেন? তারা এই বিষয়টির কোনই স্পষ্ট ব্যাখ্যা করেন নি। ‘ত্বাইয়েব একাডেমী মুলতান’ -এর অপকর্মই তাদের মিথ্যাচারের দলীল। যেমনটি এখনই আমি ইশারা করেছি। অবশ্য শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা দু’টি কপির উপর ভিত্তি করে ‘নাভীর নীচে’ -এর সংযোজন করেছেন, তন্মধ্যে একটি কপি ‘শায়খ মুহাম্মদ আবেদ সিন্ধী’র এবং অপরটি ‘শায়খ মুহাম্মাদ মুরতাযা আয-যুবায়দী’র। যেমন এই হাদীছের (হা/৩৯৫৯, ৩/৩২০) অধীনে তিনি লিখেছেন যে, ‘নাভীর নীচের’ সংযোজনটি ‘তা’ নুসখা এবং ‘আইন’ নুসখার মধ্যে প্রমাণিত আছে। যেমনটি মুহতারাম পাঠকগণ এই ভলিউমের সূচনাতে এই দু’টি কপির ছবি দেখছেন।
‘তা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল আল্লামা মুহাম্মাদ মুরতাযা যুবায়দীর নুসখা। আর ‘আইন’ দ্বারা শায়খ মুহাম্মাদ আবেদ সিন্ধীর নুসখাটি উদ্দেশ্য। শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামার ভাষ্য মোতাবেক আমি অত্র কপি দু’টির ছবিও দেখেছি। আর উক্ত দু’টি কপির যে পরিচিতি তিনি ‘মুছান্নাফ’ গ্রন্থের বিস্তারিত আলোচনার আওতায় পেশ করেছেন তাও দেখেছি। কিন্তু তারই বিস্তারিত আলোচনা মোতাবেক ‘নাভীর নীচে’ -এর সংযোজনটি এখানে সঠিক নয়। কেননা মরহূম শায়খ মুহাম্মাদ আবেদ সিন্ধীর কপি মোতাবেক খোদ শায়খ আওয়ামা স্পষ্ট করেছেন যে, ‘এই কপিটি (স্রেফ) পছন্দ (সংগ্রহে রাখার) করার জন্য। এর উপর নির্ভর করার জন্য নয় (পৃঃ ২৭)’।
সুতরাং যখন এই কপির অনিশ্চিৎ অবস্থান খোদ তিনিই বর্ণনা করে দিয়েছেন তখন আবার এর উপর ‘নির্ভর’ করা কেবল মাসলাক বাঁচানোর অপকৌশল ব্যতিত আর কি? এই কপিটি নির্ভরযোগ্য কেন নয়? এর বর্ণনাও তিনি স্বয়ং প্রদান করেছেন। এই কপিটি শায়খ মুহাম্মাদ আবেদ সিন্ধীর হস্ত লিখিত নয়। বরং তিনি ‘মুহসিন বিন মুহসিন আয-যিরাক্বী’ হ’তে ১২২৯ হিজরীতে লিখিয়ে নিয়েছিলেন। শায়খ সিন্ধী এর ভূমিকাতে ¯্রফে এর অনুচ্ছেদ সমূহের সূচি লিখেছিলেন। এই কপিটি কি আসল কপির সাথে মিলিয়ে দেখা হয়েছিল? আর যে মূল কপি হ’তে শায়খ সিন্ধীর জন্য (নতুন) কপি নকল করা হয়েছিল সেটার নির্ভরযোগ্যতার অবস্থান কি? এর বিস্তারিত আলোচনাও শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা লিখেন নি। বাহ্যত, এই বিশদ আলোচনাও অপ্রাপ্য রয়েছে তথা এর কোন সন্ধান নেই। যার দ্বারা এই নুসখাটির আরো বেশী অনির্ভরযোগ্য হওয়ার বিষয়টি সমর্থিত হয়।
রইল অপর কপিটি। যা শায়খ মুহাম্মাদ মুরতাযা আয-যুবায়দী আল-হানাফীর। যার সম্পর্কে তিনি স্বয়ং লিখেছেন যে, ‘এতে কতিপয় স্থানে আল্লামা আইনী রহেমাহুল্লাহর টীকা রয়েছে। আর এই কপিটিই শায়খ ক্বাসেম বিন কুত্বলূবুগার নযরে ছিল। এই কপি হ’তেই শায়খ ক্বাসেম বিন কুত্বলূবুগা ‘আত-তা‘রীফু ওয়াল-আখবারু বিতাখরীজি আহাদীছিল ইখতিয়ার’ গ্রন্থে এই হাদীছটিও বর্ণনা করেছেন এবং এর সনদকে ‘জাইয়েদ’ বলেছেন। এই কপি সম্পর্কেও তিনি বলেছেন যে, ‘এর উপর নির্ভর করা উপকারী’। মূলত এর উপরও নির্ভর করা সুনিশ্চিৎ নয়। (বরং) নির্ভর করার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু এই কপিতেও ঐ ক্রটিই রয়েছে; যার প্রতি আল্লামা মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধী ‘ফাৎহুল গফূর ফী ওয়াযইল আইদী আলাছ ছুদূর’ গ্রন্থে ইশারা করেছেন।
উদাহরণস্বরূপ, তার বক্তব্য হ’ল- ‘নাভীর নীচে’র সংযোজনের বিষয়টির প্রমাণিত হওয়া সম্পর্কে চিন্তার অবকাশ আছে। বরং এই সংযোজনটি ঠিক নয়। ভুলবশত কারণে এর উৎপত্তি হয়েছে। কেননা আমি মুছান্নাফের ছহীহ নুসখাটি অধ্যয়ন করেছি। আর আমি তাতে এই হাদীছটি এই শব্দে সনদসহ অবলোকন করেছি। তবে এতে ‘নাভীর নীচে’ শব্দাবলী নেই। এই হাদীছের পর ইবরাহীম নাখাঈর আছারটি বর্ণিত রয়েছে। এই হাদীছের শব্দাবলী ইবরাহীম নাখাঈর আছারের শব্দাবলীর নিকটবর্তী। আর এর শেষে ‘ছলাতের মধ্যে নাভীর নীচে’ শব্দাবলী রয়েছে। সম্ভবত লেখকের দৃষ্টি একস্থান (মারফূ হাদীছটি) হ’তে অন্য স্থানে (ইবরাহীম নাখাঈর আছারটির শেষ লাইনে) লক্ষ্যচ্যুত হয়ে গিয়েছিল। ফলে ‘মাওকূফ’ -এর শব্দাবলী ‘মারফূ’ -এর মধ্যে লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। আর যা আমি উল্লেখ করেছি এর উপর এই কথা প্রমাণ করে যে, মুছান্নাফ-এর প্রতিটি কপি এই সংযোজনের ক্ষেত্রে একইরূপ নয়। আর অসংখ্য আহলুল হাদীছ (মুহাদ্দিছগণ) এই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তাঁরা ‘নাভীর নীচে’র শব্দাবলী উল্লেখ করেন নি। বরং আমি ক্বাসেম (বিন কুত্বলূবুগা) ব্যতিত কোন আহলে ইলম তথা আলেম হ’তেই এই রেওয়ায়াতটি অত্র সংযোজন সহকারে শ্রবণও করি নি, (কোথাও) অবলোকনও করিনি {ফাৎহুল গফূর পৃঃ ৭৭, ৭৮ (মুদ্রিত : ১৯৭৭) তাহক্বীক্ব : যিয়াউর রহমান আ‘যামী)}’।
এই কথাই আল্লামা মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধী ‘দুর্রাহ ফী ইযহারি গশশি নাক্বদিছ ছুর্রাহ’ গ্রন্থেও বলেছেন।
উদাহরণস্বরূপ, তার কথাগুলি হ’ল- “এই হাদীছটি ইবনে আবী শায়বাহ বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি ইবরাহীম নাখাঈর আছারটি বর্ণনা করেছেন। আর উভয়ের শব্দাবলী নিকটবর্তী (প্রায় একই রকম বাক্য)। ইবরাহীম নাখাঈর আছারের শেষে ‘নাভীর নীচে’ শব্দগুলি আছে। আর ইবনে আবী শায়বাহর বিভিন্ন কপি রয়েছে। কতিপয় নুসখায় ইবরাহীম নাখাঈর উপরোল্লিখিত আছারটি থাকাসত্বেও হাত বাঁধার নির্দিষ্ট স্থান ব্যতিত হাদীছটি উল্লেখ হয়েছে। আর কতিপয় নুসখাতে মারফূ‘ হাদীছের সাথে ‘নাভীর নীচে’ শব্দাবলী আছে ইবরাহীম নাখাঈর আছারটি ব্যতিরেকেই। এই জন্য এই সম্ভাবনা আছে যে, মারফূ হাদীছের মধ্যে সংযোজনটি লেখকের ভুলের কারণে হয়েছে। যার মাঝে এক ছত্রের (লাইনের) মত একটি ইবারত অবশিষ্ট থেকে গিয়েছে। আর ইবরাহীম নাখাঈর আছারটির শব্দাবলী মারফূ হাদীছের ভিতরে লিখিত হয়েছে। আল্লামা সিন্ধী এই যে কথাগুলি বার বার বলেছেন; শায়খ মুহাম্মাদ মুরতাযা আয-যুবায়দীর কপির অবস্থাও একেবারেই অনরূপ। আর এই কপিটিই এর পূর্বে আল্লামা ক্বাসেম বিন কুত্বলূবুগার নিকটে ছিল যেমনটি শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামা স্পষ্ট করেছেন। এবং এই কপিতে স্রেফ মারফূ হাদীছটি রয়েছে। হযরত ইবরাহীম নাখাঈর আছারটি এ থেকে বাদ পড়েছে। যেমনটি এই ছবি হ’তে সুস্পষ্ট হয় যা শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা তৃতীয় ভলিউমের সাথে প্রকাশ করেছেন। এই কারণেই যখন এখান থেকে ইবরাহীম নাখাঈর আছারটি বাদ রয়েছে তখন এর দ্বারা আল্লামা হায়াত সিন্ধীর কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সমর্থিত হয় যে, নকলকারী লেখকের দৃষ্টি পরিবর্তনের কারণে ইবরাহীম নাখাঈর আছারটির মধ্যে ‘নাভীর নীচে’র শব্দগুলি মারফূ হাদীছের বর্ণনার সাথে লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। আর মধ্যখানে আছারের শব্দাবলী সনদসহ বাদ পড়ে গিয়েছে।
কিন্তু শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা এর দ্বারা সান্তনা লাভ করেন নি। তিনি এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। সেটি বড়ই হাস্যকর এবং আশ্চর্যজনক।
তার বক্তব্যটি হ’ল-
“এই ধারণা ও সন্দেহ হ’তে আল্লাহ তাআলার ও ইসলামের দুশমনগণ খুশী হবে। যদি এই দরজা খুলে দেয়া যায় তাহ’লে আমাদের দ্বীনী উৎস সমূহের কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তা সত্বেও আমরা কি করব যখন এই সব (বক্তব্য) শায়খ মুহাম্মাদ আবেদ সিন্ধীর নুসখার মধ্যে প্রমাণিত। যেথায় হাদীছ এবং আছার- উভয়টি আছে। আর উভয়টির সাথে ‘নাভীর নীচে’ শব্দাবলী রয়েছে (৩/৩২১)।”
আমি শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামার কাছে আবেদন করব যে,
তিনি ঈমানদারীর মাধ্যমে বলবেন যে, পান্ডুলিপি এবং মুদ্রিত গ্রন্থসমূহের লেখকদের এই প্রকারের দৃষ্টিচ্যুতির উদাহরণ কি পাওয়া যায় না? আর ইবারত নকল করার সময় এই প্রকারের ক্রটি হয় না? সম্মানিত পাঠকদের পরিতুষ্টির জন্য আমি কতিপয় উদাহরণ উপস্থাপন করছি-
(১)
“মুসনাদে ইমাম আহমাদ” গ্রন্থে একটি হাদীছের সনদ এবং তার মতন এইরূপ রয়েছে- “আমাদেরকে সুলায়মান বিন দাঊদ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। (তিনি বলেছেন) আব্বাদ বিন মানছূর আমাদেরকে হাদীছ বলেছেন ইকরিমাহ হ’তে, তিনি ইবনে আব্বাস হ’তে যে,
রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘জাম’ (নামক স্থানে) -এ বিরতি দিলেন। যখন সবকছিু পরিষ্কার হ’ল সূর্য উদয় হওয়ার আগে, তখন তিনি যাত্রা করলেন (আল-মুসনাদ হা/৩০১২, ১/৩২৭, মাত্ববাআহ মায়মুনিয়াহ, প্রকাশনায় : দারুল ইহইয়া আত-তুরাছ এবং আল-মাকতাবুল ইসলামী বৈরূত)।
{“মায়মুনিয়াহ” লেখা হয়েছে নাকি “মুহায়মিনাহ” লেখা হয়েছে তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে বাহ্যত “মায়মুনিয়াহ” লেখা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।-অনুবাদক}
মুসনাদে আহমাদের তিনটি প্রকাশনীতেই এই রেওয়ায়াতটি এভাবেই লিপিবদ্ধ আছে। অথচ বিষয়টি একেবারেই এর বিপরীত। যেমন সঠিক অবস্থা এই যে, এই সনদের মতন এবং এর পরের বর্ণনাটির সনদের কিছু অংশ লেখকের ভুলের জন্য বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। আসল সনদ এবং মতন এইরূপ-
“আমাদেরকে সুলায়মান বিন দাঊদ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। (তিনি বলেছেন) আব্বাদ বিন মানছূর আমাদেরকে হাদীছ বলেছেন ইকরিমাহ হ’তে, তিনি (ইবনে আব্বাস হ’তে যে, রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ ত্বায়বাহকে এশার সময়ে পাঠালেন। তিনি সিঙ্গা লাগালেন এবং তাকে মজুরি দিলেন। আবূ দাঊদ আমাদেরকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন যামআহ হ’তে, তিনি ইকরিমাহ হ’তে), তিনি ইবনে আব্বাস হ’তে যে, রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘জাম’-এ বিরতি দিলেন। যখন সবকছিু পরিষ্কার হ’ল সূর্য উদয় হওয়ার পূর্বে, তখন তিনি যাত্রা শুরু করলেন।”
‘মুসনাদে আহমাদ’ যা ‘বায়তুল আফকার আদ-দাওলিইয়া আর-রিয়ায’ হ’তে একটি ভলিউমে প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে এই রেওয়ায়াতটি রয়েছে (পৃঃ ২৭০)। আর মুহাক্কিক্ব ইশারা করেছেন যে, মুদ্রিত মুসনাদে আহমাদের ‘মাত্ববাহ মায়মুনিয়াহ’ (হ’তে প্রকাশিত) নুসখার মধ্যে প্রথম সনদের কিছু অংশ ও তার মতন এবং দ্বিতীয় সনদের প্রথমের অংশটি লেখকের ভুলের কারণে বাদ পড়ে গিয়েছে। বন্ধনীতে আমরা তা স্পষ্ট করেছি। লেখকের দৃষ্টি প্রথম সনদের ইকরিমাহর পরে দ্বিতীয় সনদের ইকরিমার উপর পড়ে গিয়েছিল। আর দ্বিতীয় সনদটির মতন প্রথম সনদটির মতনের সাথে জুড়ে দিয়েছেন।
দ্বিতীয় রেওয়ায়াতটি আল্লামাহ ইবনে জাওযী ‘আত-তাহক্বীক্ব’ গ্রন্থে (৩/৪৭৫), হাফেয ইবনে হাজার ‘আত্বরাফুল মুসনিদ’ গ্রন্থে (৩/২০০) এবং আল্লামা যায়লাঈ ‘নাছবুর রায়াহ’ গ্রন্থে (৪/৭৪) এভাবেই নকল করেছেন। অর্থাৎ “আবূ দাঊদ ‘যামআহ’ হ’তে, তিনি ইকরিমাহ হ’তে।” আর টীকাকার পাদটীকায় এ বিষয়টি প্রকাশ করেছেন যে, মুসনাদে ইমাম আহমাদ গ্রন্থে (১/৩২৭) এই রেওয়ায়াতটি এই সনদে নয় বরং “সুলায়মান বিন দাঊদ (বলেছেন), আমাদেরকে আব্বাদ বিন মানছূর হাদীছ বর্ণনা করেছেন ইকরিমাহ হ’তে” (সনদের মাধ্যমে) আছে। তার শব্দগুলি হ’ল-
“ইবনে আব্বাসের হাদীছটি এই সনদে আমি পাই নি। বরং তার সনদটি এইরূপ- “আমাদেরকে আব্দুল্লাহ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। (তিনি বলেছেন) আমাকে হাদীছ বলেছেন আমার পিতা। (তিনি বলেছেন) আমাদেরকে সুলায়মান বিন দাঊদ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। (তিনি বলেছেন) আব্বাদ বিন মানছূর আমাদেরকে হাদীছ বলেছেন ইকরিমাহ হ’তে, তিনি ইবনে আব্বাস হ’তে’।”
যেভাবে মুসনাদে আহমাদের মধ্যে লেখকের দৃষ্টি নীচের ছত্রে ইকরিমাহর উপর পড়ে গিয়েছিল এবং মধ্যকার অংশটি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল; (ঠিক অনুরূপভাবে) ‘আল-মুছান্নাফ’ গ্রন্থের আল্লামা যুবায়দীর নুসখাতে মারফূ রেওয়ায়াতটি লিখতে গিয়ে ‘ছলাতের মধ্যে’ (শব্দাবলী) হ’তে দৃষ্টি নীচের লাইনে ইবরাহীম নাখাঈর আছারটির মধ্যে ‘ছলাতের মধ্যে’ এর উপর পড়ে গিয়েছে।
আর মারফূ হাদীছটির সাথে এর পরের ‘নাভীর নীচে’ শব্দাবলী লিখে দিয়েছেন। এবং মাঝখানে ইবরাহীম নাখাঈর আছারের সনদ এবং এর মতনের প্রথম অংশটি লেখকের দৃষ্টির ভুলে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। যদি এই সোজা বিষয়টির দ্বারা দ্বীনের উৎস সমূহ হ’তে নির্ভরতা উঠে যাওয়ার আশংকা থাকে তাহ’লে মুসনাদে আহমাদের উপর নির্ভর করার অর্থ কি?
মুসনাদে আহমাদের মধ্যে এই একটি হাদীছই নয়; আলেমগণ খুব ভাল জানেন যে, ‘মাত্ববা মায়মুনিইয়া’ এর মধ্যে অসংখ্য হাদীছ বাদ গিয়েছে। কিন্তু কেউই নুসখার ভিন্নতার বিষয়টিকে অনির্ভরতার উপর গণ্য করেন নি। শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা এই বাস্তবতা হ’তে বেখবর নন। কিন্তু মাযহাবী গোঁড়ামী এটি গ্রহণ করতে অন্তরাল হয়েছে। (২) ইমাম আহমাদ রহেমাহুল্লাহর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থের উপরই শেষ নয়। বরং জামে তিরমিযীর মত বহুল প্রচলিত এবং সিলেবাসভুক্ত গ্রন্থের অধিকাংশ নুসখাতে “মানাক্বিবে মুআয বিন জাবাল এবং যায়েদ বিন ছাবেত ও উবাঈ বিন কা‘ব এবং আবূ উবায়েদ রাযিআল্লাহ তাআলা আনহুমদের অনুচ্ছেদ” এর মধ্যে ইমাম তিরমিযী রহেমাহুল্লাহ “ক্বাতাদা, আনাস হ’তে” একটি রেওয়ায়াত “আমার উম্মতের সবচাইতে দয়ালু হল আবু বকর” বর্ণনা করেন। অতঃপর বলেছেন, “আবূ ক্বিলাবাহ আনাস হ’তে, তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হ’তে এটি বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ বিন বাশশার আমাদেরকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। (তিনি বলেছেন) আব্দুল মাজীদ আছ-ছাক্বাফী আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। (তিনি বলেছেন) খালেদ আল-হায্যা আমাদেরকে খবর দিয়েছেন আবূ ক্বিলাবাহ হ’তে, তিনি আনাস বিন মালেক হ’তে। তিনি বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উবাই বিন কা‘বকে বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন তোমাকে সূরা আল-বাইয়িনাহ পাঠ করে শুনাতে’।” (তিরমিযী, তুহফাহ সহ ৪/৩৪৪)।
অথচ এই রেওয়ায়াতটি অত্র সনদে আদৌ (বর্ণিত) নয়। বরং এই সনদ দ্বারা “আমার উম্মতকে আবূ বকরের দ্বারা রহম করি” (হাদীছটি) বর্ণিত আছে। আর হাদীছ “রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উবাঈ বিন কা‘বকে বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন” এর সনদটি এইরূপ- “আমাদেরকে মুহাম্মাদ বিন বাশশার হাদীছ বলেছেন। (তিনি বলেছেন) আমাদেরকে মুহাম্মাদ বিন জা‘ফর হাদীছ বর্ণনা করেছেন। (তিনি বলেছেন) শু‘বাহ আমাদেরকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি ক্বাতাদাকে বলতে শুনেছি, তিনি আনাস হ’তে বর্ণনা করেন।” লেখকের ভুলে প্রথম সনদটি নকল করতে গিয়ে পরের সনদের মধ্যে “আনাস হ’তে” -এর উপর পড়েছে তথা সংযোজিত হয়ে গিয়েছে। আর মাঝখানে প্রথম সনদের ‘মতন’ যা “রহম করি আমার উম্মতকে” -এর শব্দাবলীর সাথে ছিল- এবং দ্বিতীয় হাদীছের সনদটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। আল্লামাহ মিয্যী রহেমাহুল্লাহ ‘তুহফাতুল আশরাফ’ (১/২৫৯, ৩২৫) গ্রন্থে এই ভুলের উপর খবরদারী করেছেন। বরং এটিও বলেছেন যে, “হাফেয ইবনে আসাকিরও এই রেওয়ায়াতটিকে অনুরূপভাবে ভুল সনদে বর্ণনা করেছেন।” আর স্পষ্ট করেছেন যে, “একটি হাদীছ আরেকটি হাদীছের মধ্যে প্রবেশ করেছে।” তিরমিযীর অধিকাংশ নুসখাতে এই রেওয়ায়াতটি এভাবে আছে। অবশ্য আল্লামা ইবনুল আরাবীর ব্যাখ্যা “আরিযাতুল আহওয়াযী” গ্রন্থে (১২/২০২, ২০৩) এবং ডক্টর বাশশার আওয়াদের তাহক্বীক্ব-এ “দারুল গরব আল-ইসলামী” হ’তে যে প্রকাশিত হয়েছে তাতে এই রেওয়ায়াতটি ঠিক সনদ এবং মতনে বর্ণিত আছে (৬/১২৭, ১২৮)।
হাদীছের গ্রন্থসমূহের মধ্যেই নয়; রিজালের গ্রন্থসমূহেও এই প্রকারের ভুল বিদ্যমান আছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘লিসানুল মীযান’ গ্রন্থে আছে- “মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ মুআবিয়া বিন আবূ সুফিয়ান হ’তে। তিনি বলেছেন এবং উল্লেখ করেছেন, আমাদেরকে মুনকার রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন মদপায়ী সম্পর্কে। তাকে চেনা যায় না।” এক্ষণে ‘মীযানুল ইতিদাল’ গ্রন্থে আসল ইবারতটির মধ্যে মনোযোগ দিন। আর চিন্তা করুন যে, বাস্তবতা কি থেকে কি হয়ে গিয়েছে!
“মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন মুআবিয়া বিন সুফিয়ান বলেছেন, ‘তারপর তিনি হাদীছটি বর্ণনা করেছেন’। তাকে চেনা যায় না। মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ তার পিতা হ’তে, তিনি বলেছেন, ‘তারপর তিনি মুনকার হাদীছটি বর্ণনা করলেন মদ্যপায়ী সম্পর্কে -যাকে চেনা যায় না (লিসানুল মীযান ৩/৬০৩)। আপনারা গবেষণা করেছেন যে, ‘লিসানুল মীযান’ গ্রন্থে “মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ তার পিতা হ’তে” এর জীবনীটুকু লেখকের ভুলে বাদ পড়ে গিয়েছে। প্রথম ছত্রে “তারপর তিনি হাদীছটি উল্লেখ করলেন” হ’তে দ্বিতীয় ছত্রের মধ্যে লিখতে গিয়ে “তারপর তিনি হাদীছটি উল্লেখ করলেন” এর উপর নযর চলে গিয়েছে। আর এভাবেই মধ্যকার অংশটি বাদ পড়ে গিয়েছে। যেমনটি আমি বন্ধনীর দ্বারা সুস্পষ্ট করেছি। “ইবনে মুআবিয়া বিন সুফিয়ান” -এটির “মুআবিয়া বিন আবী সুফিয়ান হ’তে” হয়ে যাওয়া তো সাধারণ বিষয়।
হাদীছের গ্রন্থসমূহে এবং রিজালের পুস্তকগুলিতে এই ধরণের অসংখ্য উদাহরণ আমাদের দৃষ্টিতে রয়েছে। আমাদেরকে তো স্রেফ এই আবেদনটি পেশ করতে হবে যে, লেখকের এই ধরণের গাফলতী এবং লেখনীজনিত ভুল হওয়া অসম্ভব নয়। উছূলে হাদীছে লেখনীর মূলনীতি এবং গ্রন্থের গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য যে মূল গ্রন্থের সাথে মিলিয়ে দেখা ইত্যাদির যে সকল শর্তসমূহ উল্লেখ আছে, সেগুলি এ সকল ভুলের (সংগঠিত হওয়া হ’তে মুক্ত থাকার জন্য) ভিত্তিতে রয়েছে। লেখকের এই ধরণের উদাসীনতা তো যে কোন বিদআতী অস্বীকার করতে পারেন।
কিন্তু পেরেশানী এই যে, শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাও এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করছেন। বরং একে দ্বীনের উৎসসমূহের উপর ‘অনির্ভরতার মাধ্যম’ বলেছেন। অথচ এই ধরণের মনুষ্য ভুল-ভ্রান্তি হ’তে তো হাদীছ জালকারীদের ধোঁকাবাজী থাকা সত্বেও আজ পর্যন্ত কোন ইলমধারী দ্বীনের উৎস সমূহের উপর সন্দেহ করেন নি। এটি তো এক দু’ শব্দের অথবা কিছু ছত্রের (লাইনের) বিষয়। (হাদীছ) জালকারীগণ গ্রন্থসমূহে কিভাবে কিভাবে পরির্বতন সাধন করেছেন, পুস্তক লিখে কিভাবে সেগুলি ইসলামের ইমামদের প্রতি সম্বন্ধিত করেছেন, গ্রন্থসমূহ ধার করে এনে সেগুলি (থেকে ইচ্ছামাফিক বিষয়বস্তু) মুছে ফেলা এবং সংযোজন করতে থেকেছেন। কিন্তু এ সকল শঠতা থাকা সত্বেও কোন নির্ভরযোগ্য আলেম দ্বীনের উৎস সমূহের -এর মধ্যে সন্দেহ এবং আশংকার ভীতি ছড়ান নি। মুহাদ্দিছগণ প্রতিটি যুগেই দুধ (থেকে) দুধ এবং পানি (হ’তে) পানি (পৃথক করে) দেখিয়েছেন।
কিন্তু আফসোস হ’ল যে, লেখকের ভুলের ক্ষেত্রে দ্বীনের উৎস সমূহ সমালোচিত হচ্ছে মর্মে শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা অনুভব করছেন।
আমাদের এই সংক্ষিপ্ত স্বচ্ছ বক্তব্য হ’তে এই বিষয়টি অর্ধ দিবসের ন্যায় পরিষ্কার হয়ে যায় যে, লেখকের ভুল এবং বিচ্যুতি হওয়া অসম্ভব নয়। আল্লামা হায়াত সিন্ধী যে কথাটি ‘আল-মুছান্নাফ’ গ্রন্থে ‘নাভীর নীচে’ -এর সংযোজনের সম্পর্কে বলেছিলেন তা একটি পরিষ্কার বাস্তবতা। আর এই ধরণের বিচ্যুতের আরও অসংখ্য উদাহরণ বিদ্যমান। এখন রইল এই কথা যে,
শায়খ মুহাম্মদ আবেদ সিন্ধীর কপিতে যখন মারফূ হাদীছ এবং ইবরাহীম নাখাঈর আছারের সাথে দু’ জায়গায় ‘নাভীর নীচে’ -এর শব্দাবলী রয়েছে তখন এর দ্বারা এর আশংকার জবাব দূর হয়ে যায়; যার প্রকাশ আল্লামা হায়াত সিন্ধী করেছিলেন। আমি ক্ষণে ক্ষণে শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামার উপর আশ্চর্য হচ্ছি যে, তিনি একদিকে গ্রন্থের ভূমিকার বিস্তারিত বর্ণনা করতে গিয়ে ছাফ ছাফ বলেছেন, ‘শায়খ মুহাম্মাদ আবেদের নুসখাটি নির্ভরযোগ্য নয়। তার দ্বারা আমরা স্রেফ (বর্ণনাটির অবস্থা) অবগত হ’তে পারে’। কিন্তু এখানে উক্ত অনির্ভরযোগ্য কপির উপর বড়ই দৃড়তার দ্বারা নির্ভরতার প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কোনই বাঁধা অনুভব করছেন না। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেঊন।
আমি হয়রান হয়ে আছি যে, যে কপিকে শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা স্বয়ং অনির্ভরযোগ্য বলেছেন তার উপরই এই নির্ভরতা কিভাবে? আর এই নুসখাটির বিপরীতে যে চারটি কপির মাঝে এই বর্ধিত অংশটুকু নেই; সেগুলির উপর অনির্ভরতা (আসে) কিভাবে? অথচ এই কপির মধ্য হ’তে একটি হ’ল ঐ কপি যার সম্পর্কে স্বয়ং শায়েখ আওয়ামা বলেছেন, “এটি সবচেয়ে পুরাতন কপি যা ৬৪৮ হিজরীতে লিখা হয়েছে। এর লেখাও বড়ই পরিষ্কার এবং সুস্পষ্ট। এর নকলকারীও ‘মুতক্বিন’ (শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য)। আর এই কপিটিও আসল হ’তে মিলিয়ে দেখা হয়েছে (পৃঃ ৩৮, ৩৯)।”
যার আলামত তিনি “খ” দ্বারা দিয়েছেন। এগুলির চাইতে সবচেয়ে ছহীহ এবং পুরাতন নুসখার উপর নির্ভরতা নেই কেন? তিনটি অতিরিক্ত নুসখা হ’তেও তার সমর্থন মেলে। এই চারটি নুসখার উপর তো তিনি নির্ভরতা প্রকাশ করছেন। অতঃপর এর উপর নির্ভরতাকে মাযহাবী দলীলবাজি না বলে আর কি বলা যাবে? @দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ@ এটাই নয়। বরং আরো আশ্চর্যজনক বিষয় এই যে, এই দু’টি নুসখা (আল্লামা মুহাম্মাদ আবেদ সিন্ধী এবং আল্লামা মুহাম্মাদ যুবায়দীর কপিদ্বয়) ব্যতিত ‘তৃতীয়’ আরোও তিনটি নুসখা এই সংযোজনকে সমর্থন করছে। সেই কপিগুলি কার থেকে এসেছে; তার (আওয়ামার) বাক্যগুলি হ’ল- “একটি কপি হ’ল আল্লামা ক্বাসেমের এবং এটাই হ’ল নুসখা “তা” (অর্থাৎ আল্লামা যুবায়দীর নুসখা)। অপরটি হ’ল মক্কা মুকার্রামার মুফতী আল্লামা আব্দুল ক্বাদের ছিদ্দীক্বীর। তৃতীয়টি হ’ল আল্লামা মুহাম্মাদ আকরাম সিন্ধীর কপি। তার থেকে আল্লামা মুহাম্মাদ হাশেম ঠাঠবী স্বীয় ‘তারছীউদ দুর্রাহ আলা দিরহামিছ ছুর্রাহ’ গ্রন্থে নকল করেছেন।
পেরেশানী হ’ল যে, আল্লামা ক্বাসেমের নুসখাকে আল্লামা যুবায়দীর কপি বলার পরও তাকে অন্য আরেকটি কপি হিসাবে কিভাবে চালানো যেতে পারে? অতঃপর উক্ত কপিকে শায়খ আবেদের কপির সাহায্যকারী বলাও ‘আঁধারের উপর অন্ধকার’ -এর সত্যায়ন। যখন শায়খ ক্বাসেমের কপিতে ইবরাহীম নাখাঈর আছারটি নেই তখন এটি শায়খ আবেদের কপির সাহায্যকারী কিভাবে বনে গেল? স্রেফ এই কারণেই যে, এতে “নাভীর নীচে” (অংশটুকু) মারফূ রেওয়ায়াতের সাথে আছে।
যদি এই বর্ধিতাংশটুকু মারফূ রেওয়ায়াতের মধ্যে ছহীহ হয়ে থাকে তবে নাখাঈর আছারটির বাদ পড়ার বিষয়টি এত জোরালোভাবে অস্বীকার করা হচ্ছে কেন? আর এটি নির্ভরযোগ্য নুসখা হ’ল কিভাবে?
যখন তিনি স্বয়ং বলেছেন যে, “অত্র নুসখাটির উপর নির্ভর করা উপকারী” -তো এখন এর উপর পরিপূর্ণ নির্ভরতা থাকা কোন ধরণের ইলমী খেদমত?
(অবশিষ্ট) রইল “আল্লামা মুহাম্মাদ আকরাম সিন্দী”র নুসখাটি। তো এর উল্লেখ করার মধ্যেও শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা সততা এবং আমানতের প্রদর্শন করেন নি। কেননা যে গ্রন্থের উদ্ধৃতি দ্বারা তিনি এই নুসখাটির কথা উল্লেখ করেছেন; সেই গ্রন্থেই শায়খ মুহাম্মাদ হাশেম সিন্ধী বলেছেন, “প্রকাশ থাকে যে, শায়খ মুহাম্মাদ আকরামের নুসখার মধ্যে ‘নাভীর নীচে’ -এর শব্দাবলী হ’ল হাদীছের সমাপ্তি। যেমনটি এখনও এতে (এই কপিতে) বিদ্যমান আছে। আর তা থেকে নাখাঈর আছার ‘নাভীর নীচে’ শব্দদ্বয় পরিপূর্ণরূপে বাদ গেছে (তাওছীউদ দুর্রাহ আলা দিরহামিছ ছুর্রাহ পৃঃ ৭)।”
নিন জনাব! শায়খ মুহাম্মাদ আকরামের কপির পর্দা তো খোদ “শায়খ মুহাম্মাদ হাশেম” উন্মোচন করে দিয়েছেন। এতেও ঐ ক্রটি এবং দোষটি রয়েছে যা ‘শায়খ ক্বাসেম’ এবং পরবর্তীতে ‘আল্লামা যুবায়দী’র কপিতে রয়েছে। এক্ষণে ইনছাফপূর্ণ শর্ত হ’ল যে, এই ‘নাভীর নীচে’ -এর (অংশটির) ছহীহ হওয়ার সমর্থক কিভাবে হ’ল? যেমনটি পূর্বেই আমরা ব্যাখ্যা করে এসেছি।
(বাকি) রইল মক্কা মোকার্রমার মুফতী আল্লামা আব্দুল ক্বাদেরের নুসখাটি। তো এ সম্পর্কে সন্দেহ ব্যতিতই শায়খ মুহাম্মাদ হাশেম লিখেছেন যে, “এতে মারফূ এবং নাখাঈর আছার-উভয়টি আছে। আর উভয়ের মধ্যে ‘নাভীর নীচে’ -শব্দাবলী রয়েছে।” কিন্তু তিনি এটি আদৌ উল্লেখ করেন নি যে, এই নুসখাটি কোন কপি হ’তে নকলকৃত আর এর নকলকারী কে। এটি মূল কপির সাথে মিলিয়ে লিখিত এবং নির্ভরযোগ্য ( হিসাবে গণ্য হয়েছে) নাকি নয়? যতক্ষণ এই বিষয়গুলি প্রমাণিত না হয়; (ততক্ষণ পর্যন্ত) এর উপর নির্ভর করা আলেমের বৈশিষ্ট নয়। এমন নুসখা দ্বারা দলীল গ্রহণ করা স্রেফ ‘ডুবতে কো তাংকে কা সাহারা’ (ডুবন্ত ব্যক্তির খড়কুটো আঁকড়িয়ে বেঁচে থাকার প্রচেষ্ট করা) -এর সত্যায়ন। @তৃতীয় পরিচ্ছেদ@
শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা ‘নাভীর নীচে’ -এর “প্রমাণ” এবং “তিনটি নুসখা” এর মধ্যে এর অস্তিত্বের উপর আলোচনার পর এটিও যরূরী অনুধাবন করেছিলেন যে, “ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলূমুল ইসলামিইয়া (করাচী)” -এর পক্ষ হ’তে প্রকাশিত “আল-মুছান্নাফ” -এর কপিতে “নাভীর নীচে” -এর বৃদ্ধির লজ্জাজনক বিকৃতিকে প্রমাণিত করতে হবে। যেমন এই বরাত হ’তে তিনি বলেছেন যে, “ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলূমুল ইসলামিইয়া” -এর পরিচালক শায়খ নূর আহমাদ আমাকে হারামে নববীতে (মসজিদে নববীতে) উল্লেখ করেছেন যে, আল-মুছান্নাফের নুসখাতে ‘নাভীর নীচে’ -এর সংযোজন শায়খ মুহাম্মাদ হাশেমের তাহক্বীক্বের ভিত্তির উপর করা হয়েছে। যা তিনি “তাওছীউর দুর্রা” গ্রন্থে ( বর্ণনা) করেছেন। আর বলেছেন, তিনটি হস্তলিখিত কপিতে এই সংযোজনটি বিদ্যমান আছে। এর দ্বারা তার (আওয়ামার) পরিপূর্ণ প্রশান্তি হয়েছে। তখন তিনি ‘নাভীর নীচে’ (শব্দদ্বয়) সংযোজন করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর মিথ্যাচার করার কোনই সাহস করেন নি আর না তিনি মাযহাবের সমর্থনে নছকে (হাদীছের ভাষ্যকে) পরিবর্তন করেন (সংক্ষেপিত, টীকা ৩/৩৬১, ৩২২)।”
আরয হ’ল যে, এই কথাটিই খোদ মাওলানা নূর আহমাদ ছাহেব লেখককে (ইরশাদুল হক্ব আছারীকে) উল্লেখ করেছিলেন। লেখক সম্মানিত উস্তাদ হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ মুহাদ্দিছ ফায়ছালাবাদী (আল্লাহ তার কবরকে আলোকিত করুন) -এর বন্ধুর গ্রন্থ সমূহ ক্রয় করার জন্য ‘ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলূমিল ইসলামিইয়া’ গিয়েছিল। হযরতুল উস্তাদ গ্রন্থগুলির খোঁজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। আর এই অধম মাওলানা নূর আহমাদ-এর নিকটে দাঁড়িয়ে যায়। আর তিনি ‘আল-মুছান্নাফ’ সম্পর্কে ঐ কথাই বলেছিলেন যা শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা উল্লেখ করেছেন। এর কিছুকাল পর ১৪০৭ হিজরী মোতাবেক ১৯৮৭ইং -তে সর্ব প্রথম লেখকই (আল্লামা ইরশাদুল হক্ব আছারী) এই বিকৃতি সম্পর্কে ইসলামী বিশ্বকে অবগত করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, মুহাদ্দিছদের মাসলাকের প্রসিদ্ধ মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘আল-ই‘তিছাম’ -এর ২০ জুমাদাছ ছানী, ১৪০৭ হিজরী মোতাবেক ২০ই ফেব্রুয়ারী ১৯৮৭ইং -এর প্রকাশনায় এর বরাতের মাধ্যমে বিস্তারিত প্রবন্ধটি প্রকাশিত করা হয়েছিল। যা পরে লেখকেরই ‘মাক্বালাত’ গ্রন্থের প্রথম খন্ডে মুদ্রিত হয়েছিল।
গবেষণাযোগ্য বিষয় এই যে, মরহূম মাওলানা নূর আহমাদ যা বলেছেন তার ভিত্তিতে ‘নাভীর নীচে’ -এর বৃদ্ধি কৃত অংশটি কি সঠিক এবং ছহীহ হয়ে যায়? যে মুদ্রিত (নুসখাটির) ছবি তিনি প্রকাশ করেছিলেন। তার দু’টি প্রকাশনায় এই সংযোজন আদৌ নেই; যেমনটি প্রথমেই আমরা উপস্থাপন করে এসেছি। এই কপির ছবিতে এই সংযোজনটি যা অন্য হরফ দ্বারা কম্পোজ করা হয়েছে বলে অনুমিত হচ্ছে। আর (তা) এবং স্বীয় বানোয়াটী এবং বিকৃত করার দোষে দুষ্ট হচ্ছে। হাদীছের গ্রন্থসমূহে (কোন শব্দ বা বাক্য) বাদ পড়া এবং (লেখনি জনিত) ক্রটিকে দূর করার কোন নিয়ম আছে নাকি নেই? ৷‘আল-মুহাদ্দিছুল ফাছিল বাইনার রাবী ওয়াল ওয়াঈ’ ‘আল-জামি লি-আখলাক্বির রাবী ওয়া আদাবিস সামি’ ‘আল-ইলমা মুক্বাদ্দামা ইবনুছ ছালাহ’ এবং উছূলে হাদীছের অন্যান্য গ্রন্থসমূহে ‘তাছহীহ’ (বিশুদ্ধকরণ) এবং ‘ইলহাক্ব’ (পরিশিষ্ট সংযোজন) -এর কোনই মূলনীতি নেই?
যদি থাকে তবে সেগুলিকে বাদ দিয়ে লাগামবিহীনভাবে (সংযোজিত) এই বর্ধিতাংশটুকু বিকৃতি নয় তো আর কি হ’তে পারে?
‘আল-মুছান্নাফ’ হাবীবুর রহমান আ‘যামীর তাহক্বীক্ব এবং সম্পাদনা দ্বারা ‘মাকতাবা ইমদাদিইয়া মক্কা মুকার্রামাহ’ হ’তে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মারফূ রেওয়ায়াত যা ‘নাভীর নীচে’ (শব্দদ্বয়) ব্যতিত বর্ণনা করেছেন। আর ইবরাহীম নাখাঈ রহেমাহুল্লাহর আছারটি বন্ধনীতে এইরূপে নকল করেছেন, “(৩৯০৭- আমাদেরকে ওয়াকী হাদীছ বর্ণনা করেছেন রবী‘ বিন আবী মা‘শার হ’তে, তিনি ইবরাহীম হ’তে। তিনি বলেছেন, ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নীচে রাখবে)।”
এই আছারের উপর টীকা নং (১) -এর মধ্যে তিনি লিখেছেন, ‘এই আছারটি আসল কপি হ’তে বাদ পড়েছে। কিন্তু এর শেষ অংশটি (অর্থাৎ নাভীর নীচে) উপরের রেওয়ায়াতের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়েছে। আর আমি এর সংশোধন ‘বা’ এবং ‘হায়দারাবী নুসখা’ হ’তে সম্পাদনা করেছি।”
মরহূম মাওলানার উক্ত বাক্যগুলি এবং ইশারা দ্বারা এই কথা স্বচ্ছ হয় যে –
(১) তার নিকটেও ‘আল-মুছান্নাফ’ -এর ঐরূপ কপিটিই ছিল যা শায়খ মুরতাযা যুবায়দী এবং শায়খ ক্বাসেমের নিকটে ছিল। যেখানে হযরত ইবরাহীম নাখাঈর আছারটি বাদ ছিল। আর তার শেষের অংশটি ‘নাভীর নীচে’ মারফূ রেওয়ায়াতের সাথে যোগ করা ছিল। আল্লামা মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধীও এমন নুসখার প্রতিই নিশানা করেছিলেন।
(২) মাওলানা আ‘যামী দু’টি নুসখার উপর ভিত্তি করে ইবরাহীম নাখাঈর আছারকে বন্ধনীর ভিতরে (বর্ণনা) করেছেন। কেননা যে কপিকে তিনি মূল এবং বুনিয়াদী বলেছেন তাতে এই আছারটি বাদ ছিল।
(৩) মাওলানা আ‘যামী মূল কপিতে বাদ পড়ার ভিত্তির উপর বিশুদ্ধ হাদীছসমূহ এবং দ্বীনের উৎস সমূহ সম্পর্কে আশংকার শিকার নন। যা শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা করেছেন প্রদর্শন করেছেন।
(৪) তিনি মূল কপি হ’তে মারফূ রেওয়ায়াতের সাথে ‘নাভীর নীচে’ -এর শব্দ থাকা সত্বেও এর উপর নির্ভর করেন নি। যেমনটি শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা এর উপর নির্ভর করে মারফূর সাথে তাকে অবশিষ্ট রেখেছেন, আর তার প্রমাণে দু’টি পৃষ্ঠাকে (কলমের কালি দ্বারা) কালো করে ফেলেছেন।
(৫) যেই কপির উপর মারফূ রেওয়ায়াতের মধ্যে শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা নির্ভর করেছেন। তাতে ইবরাহীম নাখাঈর আছারটি বাদ পড়ার কারণে তা পুণরায় অনির্ভরযোগ্য গণ্য হয়। আর অপর নুসখা ‘বা’ যা স্বয়ং তার নিকটে নির্ভরযোগ্য নয়; (তা) হ’তে আছারটি নকল করেন এবং এই পার্থক্যের কোনই আবশ্যকতা অনুভব করেন নি। আর এ সকল চালাকি তাহক্বীক্ব এবং সততার দ্বারা স্রেফ (মাযহাবী) গোড়ামীপূর্ণ মাসলাককে বাঁচানোর জন্যই করা হচ্ছে!!-সুবহানাল্লাহ।
আমাদের এই আবেদন এবং মাওলানা আ‘যামীর প্রণালী হ’তে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ‘ইদারাতুল কুরআন’ এর পরিচালকগণ সতর্কতা এবং ইশারা ব্যতিত যা সংযোজন করেছেন সেটিও ভুল এবং ইলমী আমানতের বিরোধী। @৪র্থ পরিচ্ছেদ@
——
শায়খ আওয়ামা ‘ইদারাতুল কুরআন’ -এর প্রতিরক্ষাই শুধু করবেন না; ‘ত্বাইয়েব একাডেমী’ এবং ‘মাকাতাবায়ে ইমদাদিয়া মুলতান’ -এর বিষয়টিও চিন্তা করুন। যারা দারুল ফিকর হ’তে উস্তাদ সাঈদুল লিহামের তাহক্বীক্ব হ’তে প্রকাশিত ‘আল-মুছান্নাফ’ -এর কপিতে স্পষ্ট ধোঁকাবাজি করেছেন। আর বড়ই সাহসিকতার সাথে এতে ‘নাভীর নীচে’ -এর সংযোজন করেছেন। অবশ্য তারা তাকে বন্ধনীর “ [] ” মাঝে নকল করেছেন। এবং টীকায় সংযোজনের কারণও উল্লেখ করেছেন। যে সম্পর্কে আমরা ইনশাআল্লাহ সামনে আরয করব।
“দারুল ফিকর” হ’তে এই কপিটি (যখন) প্রকাশিত হয়েছিল তখন মারফূ রেওয়ায়াতের মধ্যে “নাভীর নীচে” -এর বৃদ্ধিটুকু ছিল না। কিন্তু “ত্বাইয়েব একাডেমী” এবং “মাকতাবায়ে ইমদাদিয়া” (যখন) এই কপির আলোকচিত্র প্রকাশিত করেছেন তখন এর মধ্যে “নাভীর নীচে” -এর সংযোজন করে দিয়েছেন। তারা এর উপরই থেমে থাকেন নি। বরং “মাকতাবা রাশিদিইয়া পীরাফ ঝান্ডা” -এর কপি হ’তে হাত বাঁধা সম্পর্কিত পৃষ্ঠার ছবিও “নাভীর নীচে” -এর সংযোজনের সাথে প্রকাশ করে দিয়েছেন।
“মাকতাবা রাশিদিইয়া” -এর এই নুসখাটি লেখক একাধিকবার দেখেছে এবং তা হ’তে উপকৃত হয়েছে। আর অত্র আলোচ্য রেওয়ায়াতটির উদ্ধৃতির জন্য দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ হয়েছিল। যেথায় মারফূ রেওয়ায়াতের সাথে “নাভীর নীচে” (অংশটুকু) আদৌ নেই। এই কথাই এই কপির বরাতে মুহতারাম হাফেয ছানাউল্লাহ যিয়া ছাহেব হাফেযাহুল্লাহ স্বীয় পুস্তিকা “নামায মেঁ হাত কাহাঁ বাধেঁ” গ্রন্থে (পৃঃ ৪) কসম খেয়ে বলেছেন যে, এই কপিতে মারফূ রেওয়ায়াতের সাথে “নাভীর নীচে” -এর শব্দাবলী আদৌ নেই। বরং তিনি হযরত সাইয়েদ মুহিব্বুল্লাহ শাহ আর-রাশেদীর (আল্লাহ তার কবরকে আলোকিত করুন) ব্যাখ্যা বর্ণনাও করেছেন যে, এই কপিতে এই শব্দগুলি নেই।
যাকে আল্লাহ তাআলা দৃষ্টি দান করেছেন তিনি আজও “মাকতাবা রাশিদিইয়া” -র মধ্যে এই কপিটি দেখে তুষ্ট হ’তে পারেন।
শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা (আমাদেরকে) বলুন যে, এটি (হাদীছ) বিকৃত করার (ন্যায়) নিকৃষ্ট সাহস নয়? আর এই সকল ভেল্কিবাজি মাযহাবের সমর্থনে রাখা হচ্ছে না? @৫ম পরিচ্ছেদ@
——
শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা বলেছেন যে,
নুসখা ‘তা’ -এর কয়েকটি স্থানের আলামতের উপর আল্লামা আইনী রহেমাহুল্লাহর টীকা রয়েছে। এই কপিটিই শায়খ ক্বাসেমের নযরে ছিল। আর তিনি “আত-তাছরীফু ওয়াল-আখবার” গ্রন্থে “নাভীর নীচে” -এর শব্দাবলী হ’তে এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আর এই কপিটিই শায়খ মুহাম্মাদ মুরতাযা যুবায়দীর নিকটে ছিল। বরং যখন তিনি “ইহইয়াউল উলূম” -এর ব্যাখ্যা লিখছিলেন তখনও এই কপিটি তার দৃষ্টি সীমায় ছিল।
আর এই কপি হ’তে তিনি আছারসমূহ এবং অন্য বিষয়গুলি নকল করেন। বরং এই ব্যাখ্যার (৩/২৭০) মধ্যে এই কপির কপিকারক এবং কপির তারিখও উল্লেখ করেন। যেমনটি গ্রন্থের ভুমিকায় তিনি (পৃঃ ২৯) এর বিশদ আলোচনা করেছেন।
(১) কিন্তু চিন্তার বিষয় বরং সমাধান যরূরী মাসআলা এই যে, আল্লামা মুরতাযা যুবায়দী একে “ইহইয়াউল উলূম” গ্রন্থের ব্যাখ্যায় “ইতহাফুস সাদাতুল মুত্তাক্বীন” গ্রন্থের এই তৃতীয় খন্ডের মধ্যে হাত বাঁধা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে হানাফী মাসলাক-এর দলীল হযরত আলীর প্রসিদ্ধ রেওয়ায়াতটি “মুসনাদে আহমাদ” এবং “দারাকুৎনী” ইত্যাদি গ্রন্থ হ’তে তো উল্লেখ করছেন; কিন্তু “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থের এই ‘ছহীহ’ এবং ‘জাইয়েদ সনদ’ হ’তে বর্ণিত “রেওয়ায়াত” উল্লেখ করছেন না কেন? তার বাক্যগুলি হ’ল- “আবূ হানাফীর দলীল হ’ল যা আহমাদ, দারাকুৎনী এবং বায়হাক্বী আলী হ’তে বর্ণনা করেছেন” (ইতহাফুস সাদাহ ৩/৩৭)।
এটিই নয়। বরং হানাফী মাসলাকের সমর্থনে তিনি “উকূদুল জাওয়াহির আল-মুনীফাহ” নামে একখানা স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেখানে তিনি “আল-মুছান্নাফ” নাম দিয়ে একটি স্বতন্ত্র পর্ব লিখেছেন। সেখানেও তিনি “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থের এই রেওয়ায়াতটি উল্লেখ করেন নি। কিন্তু কেন?
প্রকাশ থাকে যে, যদি তার নিকটে এই রেওয়ায়াত এই রূপে শুদ্ধ এবং নির্ভরযোগ্য হ’ত তাহ’লে এর উল্লেখ করতেন। এটি এই বিষয়ের শক্তিশালী ইঙ্গিত যে, “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থের কপিতে এই রেওয়ায়াতের বর্ণনায় তিনি স্থিরচিত্ত ছিলেন না। আল্লামা ক্বাসেমের ঐ কপি হ’তেই নকল করা তো নির্ভরযোগ্য গণ্য; হয় কিন্তু আল্লামা যুবায়দীর একে এড়িয়ে যাওয়া অত্র নুসখাটির অনির্ভরযোগ্য হওয়ার দলীল নয় কেন? (২) বরং আল্লামা আইনীর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এই কপিতে কয়েকটি স্থানের উপর তার টীকা রয়েছে। তিনিও ছহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা “উমদাতুল ক্বারী” এবং হেদায়ার ব্যাখ্যা “আল-বিনায়া” -তে এই রেওয়ায়াতকে উল্লেখ করেন নি। তিনি হযরত আলীর যঈফ রেওয়ায়াতকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা তো করেছেন। কিন্তু কি কারণে তিনি “আল-মুছান্নাফ” -এর “জাইয়েদ সনদ” দ্বারা এই রেওয়ায়াতকে নির্ভরযোগ্য অনুধাবন করছেন না; এটি কি ইঙ্গিত নয় যে, আল্লামা আইনীও এই সনদ এবং মতনের উপর সন্তুষ্ট ছিলেন না?
(৩) আল্লামা ইবনে আব্দুল বার্র (মৃঃ ৪৬৩ হিঃ) “আত-তামহীদ” গ্রন্থে (২০/৭৪, ৭৬) ছলাতে হাত বাঁধার মাসআলা সম্পর্কে “আল-মুছান্নাফ” হ’তে কতিপয় আছার নকল করেছেন। এবং (২০/৭৫) এর উপর সংক্ষিপ্ততভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইবরাহীম নাখাঈ এবং আবূ মিজলায নাভীর নীচে হাত বাঁধার প্রবক্তা ছিলেন। আর কোন ইলম নেই যে, এই দু’জনের এই আছারদ্বয় “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থে বিদ্যমান আছে। বরং আল্লামা ইবনে আব্দুল বার্র ইবরাহীম নাখাঈর আছারটি সম্পর্কে “প্রমাণিত নয়” বলে আছারটির দুর্বলতার প্রতি ইশারাও করেছেন। যদি ওয়ায়েল বিন হুজরের রেওয়ায়াতের মধ্যেও ‘নাভীর নীচে’ -এর শব্দ থাকত তবে সেটিও তিনি উল্লেখ করতেন। একে উল্লেখ না করাও এই বিষয়ের দলীল যে, “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থে এই সংযোজনটি ভুল এবং ভিত্তিহীন।
এখানে এই কথাও স্মর্তব্য যে, কোন মাসআলার উপর দলীলের উল্লেখ না করা এবং কোন মাসআলার উপর গ্রন্থের সাথে সম্পর্কিত অনুচ্ছেদে কতিপয় আছার নকল করা এবং “নির্ভরযোগ্য সনদ” হ’তে উপরোল্লিখিত রেওয়ায়াতকে উল্লেখ না করার মধ্যেও পার্থক্য একেবারেই সুস্পষ্ট রয়েছে। আল্লামা যায়লাঈ, হাফেয ইবনে হাজার, আল্লামা ইবনুল মুলাক্কিন, আল্লামা ইবনে হুমাম ইত্যাদি পরবর্তীদের মধ্য হ’তেও কেউ এই রেওয়ায়াতের উল্লেখ করেন নি। তাদের সম্পর্কে সম্ভব যে, এটি বলা হবে যে, তারা “আল-মুছান্নাফ” -এর প্রতি প্রত্যাবর্তন করেন নি; আর না উক্ত অনুচ্ছেদের আছারসমূহকে এই “আল-মুছান্নাফ” এর উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আল্লামা ইবনে আব্দুল বার্র সম্পর্কে এ কথাটি বলার সম্ভাবনা নিশ্চিৎভাবে নেই।(৪) শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা রেওয়ায়াতসমূহের তাখরীজ এবং সেগুলির সনদসমূহের নিশানা করেন। এই অনুচ্ছেদ “ডান হাত বামের উপর রাখা” -এর রেওয়ায়াতগুলিকেও ব্যাপকভাবে তিনি তাখরীজ করেছেন। কিন্তু এই (নাভীর নীচে হাত বাঁধা) রেওয়ায়াতটির তাখরীজ কেন করেন নি?
তিনি সকল মনোযোগ বরং পুরো শক্তি “নাভীর নীচে” -এর বৃদ্ধিকৃত অংশটুকুর ছহীহ হওয়ার পক্ষে খরচ করেছেন। কিন্তু এর তাখরীজের উদ্ধৃতি প্রদান করা হ’তে মৌনতা অবলম্বন করেছেন। কিন্তু কেন?
“ওয়াকী‘ মূসা বিন নুমায়ের হ’তে, তিনি আলক্বামা হ’তে, তিনি তার পিতা হ’তে” -এর সনদ দ্বারা এই বিষয়ের কোথাও কোনই রেওয়ায়াত কি ছিলও না যে, তার সম্পর্কে তিনি চুপ থেকেছেন? যদি ছিল, তাহ’লে তা হ’তে মৌনতা অবলম্বন এবং বেপরোয়া থাকা এই আশঙ্কার ভিত্তিতে নয় যে, তার দ্বারা এই বর্ধিতাংশটুকুর নির্ভরযোগ্যতা অর্জিত হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা-ই “আর-রাক্বীবুল আলীম বিন-নিইয়াত” (অন্তরের নিয়াতের পর্যবেক্ষক, অবগত)। যেমনটি তিনি এই রেওয়ায়াতের উপর আলোচনার সমাপ্তিতে লিখেছেন।
কিন্তু মানহাজ হ’তে সরে গিয়ে এর তাখরীজ করা থেকে বিরত থাকা এই বিষয়টি দোষে দুষ্ট হচ্ছে না যে, এখানে বিষয়টি গোপন রাখা এবং চালাকী রয়েছে। অন্য কথায়, সকল কারবারই শিশুসুলভ আখ্যা পাবে আর মাসলাকী সমর্থনের দলীলবাজি হিসাবে আখ্যায়িত হবে।
আমরা নিবেদন করছি যে,
ইমাম ওয়াকীর এই সনদটি থেকে এই রেওয়ায়াতটি মুসনাদে আহমাদ (৪/৩১৬), সুনানে দারাকুৎনী (১/২৮৬) এবং বাগাবীর শরহে সুন্নাহ (৩/৩০) গ্রন্থে “নাভীর নীচে” অংশটুকু ব্যতিত রয়েছে। ইমাম ওয়াকীর সমকালীন ইমাম আব্দুল্লাহ বিন মুবারকও এই রেওয়ায়াতটি “মূসা বিন নুমায়ের” হ’তে অত্র সংযোজন ব্যতিরেকে বর্ণনা করেছেন। অধ্যয়ন করুন নাসাঈ (১/১০৫), নাসাঈর আস-সুনানুল কুবরা; আত-তামহীদ (২০/৭২)। ওয়াকীর তৃতীয় (আরেকজন) সমকালীন ইমাম আবূ নুআইম ফযল বিন দুকাইন রহেমাহুল্লাহও এই রেওয়ায়াতটি সংযোজন ব্যতিত রেওয়ায়াত করেছেন। দেখুন আত-তামহীদ (২০/৭২), বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা (২/২৮), ত্বাবারানী, আল-মুজামুল কাবীর (২২/৯) মিযযীর তাহযীবুল কামাল (১১/৪৯৯)। (মূসা বিন নুমায়েরের জীবনী দ্রঃ)।
এটাই কারণ যে, হানাফী মাসলাকের প্রসিদ্ধ আল্লামা নিমাবী “আত-তালীকুল হাসান” গ্রন্থে এই সংযোজনকে “অসংরক্ষিত” বলেছেন।
উদাহরণস্বরূপ, প্রথমে তিনি এর সম্পর্কে হাফেয ক্বাসেম বিন কুত্বলূবুগা, আল্লামা আবুত ত্বাইয়েব আল-মাদানী এবং শায়খ মুহাম্মাদ আবেদ সিন্ধীর বরাত দিয়ে লিখেছেন (যে), তারা একে “সনদ জাইয়েদ” “এর রাবীগণ ছিক্বাহ” বলেছেন। অতঃপর আল্লামা মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধীর অবস্থান বর্ণনা করেছেন যে, এই সংযোজনটি লেখকের ভুলের কারিশমা। এরপর এর জবাবে আল্লামা ক্বাসেম সিন্ধীর “ফাওযুল কিরাম” গ্রন্থ হ’তে আল্লামা হায়াত সিন্ধীর খন্ডন বর্ণনা করেছেন যে, এই সংযোজনটি ছহীহ। এই সকল বিস্তারিত আলোচনা নকল করার পর লিখেছেন, “ইনছাফের বিষয় এই যে, যদিও ‘আল-মুছান্নাফ’র অধিকাংশ নুসখার মধ্যে এটি থাকার কারণে ছহীহ। কিন্তু এই বর্ধিতাংশটুকু ছিক্বাহ রাবীদের বিরোধী হওয়ার কারণে অসংরক্ষিত হয়েছে” (আত-তালীকুল হাসান পৃঃ ৭১, মুলতান)।
‘অধিকাংশ নুসখা’র বিষয়টি তো আমরা পরে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। এখানে আমাদেরকে স্রেফ এতটুকু উল্লেখ করতে হবে যে, আল্লামা নিমাবী এই বর্ধিত অংশটুকুকে ‘গায়ের মাহফূয’ বলেছেন। আর তিনি আল্লামা ক্বাসেম ইত্যাদির ন্যায় নির্ভরযোগ্য নন যে তার দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে।
বরং মাওলানা বদর আলেম “ফায়যুল বারী” -এর টীকায় আল্লামা নিমাবীর এই অবস্থানই তার অন্য আরেকটি গ্রন্থ “আদ-দুর্রাতুন নুছরাহ ফী ওয়াযইল ইদাইনি তাহতাস সুর্রাহ” হ’তে নকল করেছেন যে, আল্লামা নিমাবী ‘শায়খ ক্বাসেম’ ও ‘শায়খ মুহাম্মদ আবেদ সিন্ধী’ এবং ‘আল্লামা আবুত ত্বাঈয়েব আল-মাদানী’র পরিবর্তে এই রেওয়ায়াতের তাওছীক্বের উপর সন্তুষ্ট নন। তার কথাগুলি হ’ল- “আল্লামা যহীর আহসান নিমাবী এর উপর সন্তুষ্ট ছিলেন না। ‘এর বর্ধিতাংশটুকু ক্রটিযুক্ত’ -তিনি এই মতটির পক্ষে গিয়েছেন” (হাশিয়াহ ফায়যুল বারী ২/২৬৭)।প্রকাশ থাকে যে, ইমাম ওয়াকী এবং তার অন্য সমকালীনগণের রেওয়ায়াতগুলি বিশুদ্ধ হাদীছের গ্রন্থসমূহে বিদ্যমান। আর তাতে “নাভীর নীচে” শব্দাবলী নেই। “আল-মুছান্নাফ” -এর কয়েকটি কপিতেও এই বৃদ্ধি নেই। এখন এটি ইলম এবং সততার কোন মানদন্ড যে, “অনির্ভরযোগ্য” এবং “ভুল কপিসমূহ” -এর ভিত্তির উপর একে ছহীহ বলা যায়। আর অন্য কপিতে ইবরাহীম নাখাঈর আছারটির বাদ পড়ে যাওয়াও তিনি স্বীকার করেছেন। যেমনটি প্রথমে আবশ্যিকভাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
রইল আল্লামা নিমাবীর এই কথা যে, “আল-মুছান্নাফ” -র অধিকাংশ কপিতেই এই বৃদ্ধিটুকু পাওয়া যায়। তো এই কথা তিনি মূলত প্রথমে আল্লামা ক্বায়েম সিন্ধীর পুস্তিকা “ফাওযুল কিরাম” হ’তে নকল করেছেন। আর এটির অবস্থা অবলোকন করেই তিনি অধিকাংশ কপিতে এর অস্তিত্ব উল্লেখ করেছেন। স্বয়ং তিনি কোন কপির কথা উল্লেখ করেন নি। অবশ্য “আদ-দুর্রাতুয যুর্রাহ” গ্রন্থে “মাকতাবা মাহমূদিয়া” -র নাম তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই কপিতে এই বৃদ্ধিটুকু বিদ্যমান। আর এটিই সেই কপি যাকে শায়খ আওয়ামা “এর উপর নির্ভরযোগ্য করা যায় না” বলে অনির্ভরযোগ্য বলেছেন।
“ফাওযুল কিরাম” -র কপিটি “পীরে ঝান্ডা” -এর লাইব্রেরীতে লেখকের নযরে পড়েছিল। আর তার একটি নকল (কপি) লেখকের নিকটে বিদ্যমান আছে, বি-হামদিল্লাহ। এর বরাতে আল্লামা নিমাবী যা নকল করেছেন; সেই ইবারত এই সময়েও দৃষ্টির সম্মুখে রয়েছে। যেথায় শায়খ ক্বায়েম “শায়খ আব্দুল ক্বাদের” -এর (মুফতী মাক্কা মুকার্রমা) কপি এবং শায়খ ক্বাসেম-এর “আত-তাছরীফু ওয়াল-আখবার বি-তাখরীজি আহাদীছিল ইখতিয়ার” গ্রন্থে এই রেওয়ায়াতকে নকল করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এখন বলুন যে, এটি “দু’টি নুসখা” কিভাবে বনে গেল? এই দু’টি কপির বরাত দ্বারা এই কথাও প্রথমে গত হয়েছে এবং শায়েখ ক্বাসেমের কপিটিই ক্রটিযুক্ত। এর উপর নির্ভর করার অর্থ কি?
এর বিপরীতে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী মরহূম আল্লামাহ হায়াত সিন্ধীর অবস্থান বর্ণনা করার পর বলেছেন, “কোন আশ্চর্য নেই যে বিষয়টি অনুরূপ হওয়াতে (যেমনটি আল্লামা হায়াত সিন্ধী বলেছেন)। কেননা আমি মুছান্নাফের তিনটি নুসখা অধ্যয়ন করেছি। সেগুলির কোন একটিতেও ‘নাভীর নীচে’ অংশটুকু পাই নি” (ফায়যুল বারী ২/২৬৭)।
আল্লামা কাশ্মিরী এই তিনটি কপির স্বচ্ছতা ব্যাখ্যা করেন নি যে, সেগুলি কোন্ কোন্ লাইব্রেরীতে ছিল। কিন্তু, যাহোক, দু’টির বিপরীতে তিনটি তো আছে। আর শায়খ আওয়ামা “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থের (৩/৩২১) টীকায় স্বীকার করেছেন যে, চারটি নুসখাতে এই সংযোজনটি নেই।
মাওলানা হাবীবুর রহমান আ‘যামীও এই কপিগুলির উপর নির্ভর করেছেন; বিকৃত কপিগুলির উপর নয়। যেমনটি গত হয়েছে। ১৯৮৯ইং এর মধ্যে “শায়খ কামাল ইউসূফ” -এর সম্পাদনায় “দারুত তাজ বৈরূত” হ’তে যে “মুছান্নাফ” -এর কপি প্রকাশিত হয়েছিল তাতেও “নাভীর নীচে” -এর বৃদ্ধি ছিল না। কিন্তু পরে “ত্বাইয়েব একাডেমী (মুলতান)” একে সংযোজন করেছে। যেমনটি আলোচিত হয়েছে। শায়খ হাম্দ বিন আব্দুল্লাহ এবং শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীমের তাহক্বীক্ব হ’তে “আল-মুছান্নাফ” -এর একটি ভলিউম প্রকাশিত হয়েছিল। অবগত হ’তে পারিনি যে, তা পূর্ণাঙ্গ হ’তে পেরেছে নাকি নয়। এই কপিকে তারা আটটি হস্তলিপি কপির এবং তিনটি মুদ্রিত কপির সাথে মিলিয়ে দেখে প্রকাশ করেছেন। এর ভুমিকায় তারা ইদারাতুল কুরানের পক্ষ হ’তে (প্রকাশিত) বিকৃত নুসখাটির উল্লেখও করেছেন। তারা লিখেছেন, “অত্র হাদীছটি তিনটি মুদ্রিত নুসখার মধ্যে পাওয়া যায় (১/৩৯০) এই (নাভীর নীচে) বর্ধিতাংশটুকু ব্যতিত। ইদারাতুল কুরআনের প্রকাশক উৎসটি বলে দেন নি যে, কোথা হ’তে এই সংযোজনটি পাওয়া গিয়েছে আর কোথায় অত্র নুসখাটি রয়েছে। এরই ভিত্তিতে ইদারাতুল কুরআনের প্রকাশিত নুসখাটির উপর নির্ভরযোগ্যতা বাকি থাকে নি। বরং এর সকল মুদ্রিত গ্রন্থসমূহ আর নিভরযোগ্য রইল না। যারা নবীর উপর মিথ্যা বলতে পারেন তাদের উপর কি আশা করা যেতে পারে ” (মুক্বাদ্দামা, আল-মুছান্নাফ ১/৫, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)।
তিনটি মুদ্রিত কপি এবং আটটি পান্ডুলিপির বিপরীতে ইদারাতুল কুরআন-এর সাহসের উপর যে প্রত্যাখ্যানমূলক আওয়ায এই হযরতগণ বুলন্দ করেছেন; তারপরও বলা যেতে পারে কি যে, “অধিকাংশ কপিতে এই (নাভীর নীচে) সংযোজনটি বিদ্যমান কক্ষনো নয় অতপর কক্ষনো নয় । (৫) আল্লামা আলাউদ্দীন ইবনুত তুরকুমানী (মৃঃ ৭৪৫ কিংবা ৭৪৯) “আল-জাওহারুন নাক্বী” গ্রন্থে ইমাম বায়হাক্বীর উপর সমালোচনা করার সাথে সাথে হানাফী মাসলাকের পক্ষে যে উকালতি করেছেন; আলেমগণ এই অবস্থান সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। ছলাতে হাত বাঁধার মাসআলাতেও তিনি স্বীয় মাসলাককে বাঁচিয়েছেন। এবং এই প্রসঙ্গে ইমাম বায়হাক্বীর অবস্থানের বিপরীতে “মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ” হ’তে আবূ মিজলাযের আছার “নাভীর নীচে” হাত বাঁধা সম্পর্কে সনদবিহীনভাবে নকল করেছেন (আল-জাওহারুন নাক্বী ২/৩১)।
ইনছাফমূলক শর্ত হ’ল যে, যদি “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থে হযরত ওয়ায়েল বিন হুজরের রেওয়ায়াতের মধ্যে নাভীর নীচের শব্দাবলী থাকত তবে তিনি উল্লেখ করতেন না? ইমাম বায়হাক্বী “হযরত ওয়ায়েল” -এর রেওয়ায়াতটি মূসা বিন নুমায়ের -এর সনদ দ্বারাও উল্লেখ করেছেন। যেথায় ‘নাভীর নীচে’ নেই। যেমনিভাবে আমরাও এখনই উল্লেখ করলাম। আর “মুয়াম্মাল বিন ইসমাঈল ছাওরী হ’তে, তিনি আছেম বিন কুলায়েব হ’তে, তিনি তার পিতা হ’তে, তিনি ওয়ায়েল হ’তে” -এর সনদে “আলা ছদরিহী” (বুকের উপর) এর শব্দাবলীও উল্লেখ করেছেন। আল্লামা মারদীনী প্রথম রেওয়ায়াতের উপর একেবারেই চুপ আছেন এবং অন্য দিকে মুয়াম্মালের উপর ভিত্তি করে সমালাচনা করেন। এর বিপরীতে “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থের মধ্যে “সনদ জাইয়েদ” দ্বারা “নাভীর নীচে” অংশটুকুর বর্ণনা করা হ’ত তবে তিনিও নিশ্চিৎ উল্লেখ করতেন। তার এই চুপ থাকাও এ বিষয়টির পরিষ্কার দলীল যে, “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থের কোন নির্ভরযোগ্য নুসখাতে ৭৪৫ হিজরী পর্যন্ত “নাভীর নীচে” -এর শব্দাবলী ছিল না।
আমাদের এই আবেদন দ্বারা দিনের মধ্যভাগের ন্যায় এ কথা পরিস্কার হয় যে, “আল-মুছান্নাফ” গ্রন্থে “নাভীর নীচে” -এর সংযোজনটি হযরত ওয়ায়েল বিন হুজর রাযিআল্লাহ তাআলা আনহুর হাদীছে নিশ্চিৎ ভাবে ছহীহ নয়। আর শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা চারটি কপির মোকাবেলায় যে দু’টি কপির উপর ভিত্তি করে সংযোজন করেছেন এবং একে ছহীহ প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করেছেন; তা তার স্বীয় স্বীকৃত মূলনীতির আলোকে ঠিক নয়।

বহুল প্রচলিত কিছু জাল হাদীছ

আরো দেখুন…

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহপূর্বক ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া‘র মন্তব্যের নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন। আপনার ই-মেইল ঠিকানা গোপন থাকবে। নামই-মেইল আবশ্যক।

© ২০১১ ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া