তাক্বলীদপন্থীদের দলিল ও তার জবাবঃ ১,২,৩,৪.

ইসলামে পীরতন্ত্র হারাম

তাক্বলীদপন্থীদের দলিল ও তার জবাবঃ ১
#দলিল নং-১ঃ “যদি না জান তবে জ্ঞানী লোকদেরকে জিজ্ঞাসা কর।”(নাহল-৪৩,আম্বিয়া-৭)
অতএব এখানে আলেমদের তাক্বলীদ করতে বলা হয়েছে।
জবাবঃ #প্রথমত,উক্ত আয়াতে ‘আহলুয যিকর’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ অহির বিধানের অনুসারী বা কুরআন-হাদীছের অনুসারী। তাই এখানে কোন মুকাল্লিদ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করা হয় নি।তাছাড়া এখানে কোন একক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করা হয়নি বরং কুরআন ও হাদীছে পারদর্শী যেকোন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা যায়।
#দ্বিতীয়ত, সুরা নাহলের ৪৩-৪৪ আয়াতের দিকে লক্ষ্য করলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয় যে, দলীলসহ জিজ্ঞাসা করতে হবে-“যদি না জান তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর, দলীলপ্রমাণ ও গ্রন্থসহ।”
তাই বুঝাই যাচ্ছে তাক্বলীদ নয় বরং ইত্তেবা করতে হবে।

#দলিল নং-২ঃ “হে ঈমানদারগণ!আল্লাহর আনুগত্য কর,আনুগত্য কর রাসুলের ও উলিল আমরগণের।”(নিসা-৫৯)
যেহেতু আল্লাহ তায়ালা এখানে আলেমদের আনুগত্যের কথা বলেছেন তাই তাদের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব।
জবাবঃ #প্রথমত, এখানে আগে বলা হয়েছে আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করতে।অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করার লক্ষ্যেই উলিল আমরের
আনুগত্য করতে হবে।
#দ্বিতীয়ত, উলিল আমর বলতে শাসক ও আলেম উভয় শ্রেণীকেই বুঝায়।তারা যদি সত্যের বিরোধিতা করেন তাহলে তাদের কথা মানা যাবে না।কেননা রাসুল সাঃ বলেছেন, “আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতায় সৃষ্টিজীবের কথা মানা যাবে না।” (মুত্তাফাক্ব আলাইহি,মিশকাত হা/৩৬৬৫)তাই তাদের কথা দলিল প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করে মানতে হবে।
#তৃতীয়ত, এই আয়াতের পরের অংশেই বলা হয়েছে -“যদি তোমাদের মাঝে মতবিরোধ হয় তবে তা ফিরিয়ে দাও আল্লাহ ও রাসুলের দিকে।”অতএব মুজতাহিদগণের যেখানে মতপার্থক্য রয়েছে সেখানে কুরআন ও হাদীছের আলোকে যাচাই করে যে মত অগ্রগণ্য হবে সেটাই গ্রহণ করতে হবে। তাই কিভাবে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির তাক্বলীদ করা যেতে পারে?

#দলিল নং-৩ঃ ওমর বিন খাত্তাব রাঃ শুরাইহ রাঃ এর নিকট লিখেছিলেন,”হে শুরাইহ, তুমি আল্লাহর কিতাব দ্বারা বিচার ফায়সালা কর,অতঃপর কিতাবে যদি না পাও তবে সুন্নাহ দ্বারা ফায়সালা কর,তাতেও যদি না পাও তবে সালেহ বা নেককার ব্যক্তিদের ফায়সালা গ্রহণ কর।(নাসায়ী,দারেমী) অতএব উল্লেখিত আছার দ্বারা প্রমাণিত হয় তাক্বলীদ জায়েজ।
#জবাবঃ তাক্বলীদ বাতিল হওয়ার জন্য এটা খুবই শক্তিশালী একটি দলিল।ওমর রাঃ প্রথমে কুরআন দ্বারা ফায়সালা করতে বলেছেন।অর্থাৎ কুরআনে সুস্পষ্ট বিধান পাওয়া গেলে অন্যদিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই।কুরআনে সুস্পষ্ট বিধান না পাওয়া গেলে সহীহ সুন্নাহ দ্বারা ফায়সালা করতে হবে।অতঃপর কুরআন সুন্নায় বিধান সুস্পষ্ট না হলে সাহাবীগণের আছার দ্বারা ফায়সালা করতে হবে। মাযহাব প্রতিষ্টিত হওয়ার আগে সোনালী যুগে এটাই ছিল সালাফগণের নীতি। কিন্তু আমরা মুকাল্লিদদের ক্ষেত্রে দেখতে পাই তাদের অবস্থা সম্পুর্ণ বিপরীত। যেকোন মাসআলায় তারা আগে দেখে তাদের মাযহাবের ইমাম কি বলেছেন। ইমামের কথা যদি কুরআন সুন্নাহর বিপরীতও হয় তবু তারা তা ছাড়তে নারাজ।ইমামের কথাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনে কুরআনের অপব্যাখ্যা, যয়ীফ জাল হাদীছ আনয়ন করবে, শেষমেষ বলবে আমাদের ইমাম কি কম বুঝতো?

#দলিল নং-৪ঃ “আর যদি লোকেরা এ বিষয়টি রাসুল ও উলিল আমরের কাছে পেশ করত,তবে যাদের ইস্তিম্বাত করার যোগ্যতা আছে তারা বিষয়টি উদঘাটন করত।”(নিসা -৮৩)
এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, যে লোকদের সিদ্বান্ত নেবার যোগ্যতা নেই তাদের উচিত ঐসব লোকদের তাক্বলীদ করবে যারা ইজতিহাদ ও ইস্তিম্বাতের যোগ্যতা রাখে।
জবাবঃ #প্রথমত, পুর্ণাঙ্গ আয়াতটি হচ্ছে -“আর যখন তাদের কাছে শান্তি বা শংকা সংক্রান্ত খবর আসে তারা সেটার প্রচারে লেগে যায়।অথচ যদি লোকেরা এ বিষয়টি রাসুল ও উলিল আমরের কাছে পেশ করত,তবে যাদের ইস্তিম্বাত করার যোগ্যতা আছে তারা বিষয়টি উদঘাটন করত।”(নিসা -৮৩)
এ আয়াতের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। শান্তি বা যুদ্বের সময় গুজব ছড়ানো উচিত নয়, বরং দায়িত্বশীলদের নিকট খবরগুলো পেশ করা উচিত।
#দ্বিতীয়ত, এ আয়াতে মৃত মানুষের তাক্বলীদের দলিল কোথায়? বরং এ আয়াতে তাক্বলীদের খন্ডন করা হয়েছে।কেননা আয়াতটির মুল দাবী হল, কোন খবরকে বিনা তদন্তে গ্রহন করা যাবে না। বিশ্লেষণ করতে না পারলে কারো দ্বারা বিশ্লেষণ করে নিবে।
#তৃতীয়ত, এ উদ্বৃতির দাবী স্বয়ং মাযহাবী আলেমরাই লংঘন করছেন।তারা নিজেরা গবেষণার মাধ্যমে সঠিক বিষয় উদঘাটন না করে মৃত ব্যাক্তিবিশেষের মাযহাব মানার দোহাই দিয়ে ঠিক বা ভূল নির্বিশেষে সব ব্যাপারেই তাক্বলীদ করছেন।
#চতুর্থত, উলিল আমর অর্থ কি?মুজতাহিদ না মুকাল্লিদ? যদি মুজতাহিদ উদ্দেশ্য হয়, তবে কি মুজতাহিদ দুই প্রকার-আহলে ইস্তিম্বাত ও গায়রে আহলে ইস্তিম্বাত? কখনোই না, গায়রে আহলে ইস্তিম্বাত কখনো মুজতাহিদ হতে পারে না। মুকাল্লিদ ও মুজতাহিদ শব্দ দুটি পরস্পরবিরোধী, কোন মুকাল্লিদ কখনও মুজতাহিদ হতে পারে না।

তাক্বলীদপন্থীদের দলিল ও তার জবাবঃ ২
দলিল-৫ঃ যেমন সাত প্রকারের ক্বিরআতের মধ্যে যেকোন এক প্রকারের ক্বিরআতে কুরআন তেলাওয়াত জায়েজ, তেমনি চার মাযহাবের যে কোন এক মাযহাবের তাক্বলীদ করা জায়েজ।এ দুটির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
#জবাবঃ এই যুক্তি স্পষ্টত ভূল।কেননা সাত প্রকার ক্বিরআত রাসুল (সাঃ) হতে মুতওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত।(দেখুন- বুখারী হা/২৪১৯,মুসলিম হা/৮১৮, মিশকাত হা/২২১১)
আরবের বিভিন্ন গোত্রের মানুষের কুরআন তেলাওয়াত সহজ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা সাত প্রকার ক্বিরআত নাযিল করেছেন। আর এই কারণে প্রত্যেক মুসলিমের উপর যে কোন এক প্রকারের ক্বিরআত জায়েজ।কিন্তু প্রচলিত চার মাযহাব মান্য করা ওয়াজিব হওয়ার কোন বিধান আল্লাহ তায়ালা নাযিল করেছেন কি?

দলিল-৬ঃ আনাস রাঃ হতে বর্নিত, তিনি বলেন,আমি রাসুল (সাঃ) কে বলতে শুনেছি- “আমার উম্মত কখনই গোমরাহীর উপর একমত হবে না।সুতরাং যখন তোমরা মতবিরোধ দেখ তখন তোমরা বড় জামআতের অনুসরণ কর।(ইবনু মাযাহ হা/৩৯৫০)
উক্ত হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয়,অধিকাংশ মুসলিম যে মতের উপর প্রতিষ্টিত সে মতেরই অনুসরণ করতে হবে।আমাদের দেশে যেহেতু হানাফী মাযহাবের লোক বেশী সেহেতু হানাফী মাযহাবের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব।
#জবাবঃ হাদীছটি নিতান্তই জয়ীফ। এ হাদীছে আবু খালাফ আল আমা নামের একজন রাবী রয়েছে যাকে ইবনু হাজার পরিত্যক্ত এবং ইবনু মুআইন তাকে মিথ্যাবাদী বলেছেন।(তাক্বরীবুত তাহযীব ১/৬৩৭ পৃঃ)
তাছাড়াও উক্ত হাদীছটি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের বিরোধী-
“আর যদি তুমি যারা যমীনে আছে তাদের অধিকাংশের আনুগত্য কর তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে ছাড়বে।তারা শুধু ধারণারই অনুসরণ করে এবং তারা শুধু অনুমানই করে।নিশ্চয়ই তোমার রব অধিক অবগত তার সম্পর্কে যে তাঁর পথ হতে বিচ্যুত হয় এবং তিনি অধিক অবগত হেদায়াত প্রাপ্তদের সম্পর্কে। “(আনআম ১১৬-১১৭)

দলিল-৭ঃ সাহাবীগণের যামানায় তাক্বলীদ ছিল।অধিকাংশ সাহাবী কয়েকজন সাহাবীর তাক্বলীদ করতেন।
জবাবঃ উক্ত ধারণা সম্পুর্ণ ভূল।সাহাবীগণ কোন বিষয় জানা না থাকলে যারা জানতেন তাদের কোন একজনকে রাসুল সাঃ এব্যাপারে কি বলেছেন বা করেছেন তা জেনে নিতেন।অর্থাৎ সাহাবীগণ কুরআন ও হাদীছের দারস দিতেন।যেমন ওস্তাদ ও ছাত্রের মাঝে হয়ে থাকে।এটাকে তাক্বলীদ বলা হয় না।তাই আমরাও আলেমদের কাছ থেকে কোন বিষয় জেনে নিতে পারি,তবে কোন নির্দিষ্ট আলেমের কাছে জিজ্ঞাসা করে নয়, বরং যেসকল আলেম কুরআন ও সুন্নাহর দলিলসহ ফতোয়া দেন তাদের যে কারও কাছ থেকে।
এবার নিম্নের হাদীছগুলো দেখি সাহাবীগণ কি চিন্তা করতেন,
১।আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন-“সাবধান! তোমাদের কেউ যেন ঐ ব্যক্তির ন্যায় দ্বীনের ব্যপারে কারও তাক্বলীদ না করে, যে (যার তাকলীদ করা হয়)
ঈমানদার হলে সে (মুকাল্লিদ) ঈমানদার হয়,আর কাফির হলে সেও কাফির হয়।”(সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী হা/২০৮৪৬,সনদ সহীহ)
২।ইবনে শিহাব (রাঃ) হতে বর্নিত, “সিরীয় এক লোক আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) কে হজ্বে তামাত্তু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আবদুল্লাহ ইবনে উমার রাঃ বললেন তা হালাল।তখন সিরীয় লোকটি বলল,’তোমার পিতা (উমার বিন খাত্তাব রাঃ) তা নিষেধ করেছেন।’ তখন আবদুল্লাহ ইবনে উমার রাঃ বললেন,’যে কাজ আমার পিতা নিষেধ করেছেন সে কাজ যদি রাসুল সাঃ পালন করেন, তাহলে রাসুল সাঃ এর নির্দেশ অনুসরণযোগ্য না আমার পিতার নির্দেশ অনুসরণযোগ্য? ‘ লোকটি বলল,’বরং রাসুলুল্লাহ সাঃ এর নির্দেশ অনুসরণযোগ্য। ‘ আবদুল্লাহ ইবনু উমার রাঃ বললেন,”রাসুলুল্লাহ সাঃ হজ্বে তামাত্তু আদায় করেছেন। ”(তিরমিযি হা/৮২৩,সনদ সহীহ)

দলিল-৮ঃযেহতু কুরআন ও হাদীছ সকলের পক্ষে বুঝা সম্ভব নয় তাই বর্তমানে সরাসরি কুরআন ও হাদীছের উপর আমল করা যাবে না।বরং চার ইমামের যে কোন একজনের অনুসরণ করতে হবে।
#জবাবঃ শরীআতের যেকোন আমল কুরআন ও সহীহ হাদীছ মোতাবেক হওয়া আবশ্যক,কোন ইমাম বা মাযহাবের রায় অনুসারে নয়।তবে এ ককথা ঠিক কুরআন হাদীছের খুটিনাটি বিষয় সকলের পক্ষে বুঝা সম্ভব নয়।এজন্য বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের সহযোগিতা গ্রহণ করতেই হবে।(নাহল-৪৩, আম্বিয়া-৭)।কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে নির্দিষ্ট একজন ইমাম বা মাযহাবের তাক্বলীদ করতে হবে। কোন মাযহাব বা ইমাম বা বিদ্বানের রায় যদি কুরআন ও হাদীছের বিপরীত হয়, তবে সে সিদ্বান্ত অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে এবং কুরআন ও সহীহ হাদীছের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে (নিসা-৫৯)।কোন ইজতিহাদী বিষয়ে একাধিক মত থাকলে যে মত কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী সেটাই গ্রহণ করতে হবে, সেটা কোন্ মাযহাবের মত তা বিবেচ্য নয়। আর এভাবে মাযহাবের নামে দলাদলি থেকেও বাঁচা সম্ভব।
নিচের সহীহ হাদীছ খানার দিকে লক্ষ্য করলেই উপরের বিষয়টা আরও পরিস্কার ভাবে বুঝা যাবেঃ
রাসুল (সাঃ) বলেন, “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন ঐ দুটি বস্তুকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরে থাকবে ততদিন পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাহ। “(মুওয়াত্তা মালেক হা/৩৩৩৮)

সত্যানুসন্ধানী সুমন wrote a new note: তাক্বলীদপন্থীদের দলিল ও তার জবাবঃ ৩.
#দলিল-৯ঃ মুআয রাঃ এর সঙ্গীগণ থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাঃ মুআয রাঃ কে গভর্ণর হিসাবে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় প্রশ্ন করলেন, তুমি কিভাবে বিচার করবে? তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বিচার করব। রসূলুল্লাহ সাঃ বললেন, যদি আল্লাহর কিতাবে না পাওয়া যায়? তিনি বললেন, তাহলে রসুলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নাহ (হাদিস) অনুযায়ী বিচার করব। রসূলুল্লাহ সাঃ বললেন, যদি সুন্নাহতেও না পাও? তিনি বললেন, আমি আমার জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে ইজতিহাদ (গবেষণা) করব। তিনি সাঃ বললেন, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আল্লাহর রসূলের প্রতিনিধিকে এরূপ যোগ্যতা দান করেছেন।

সূত্রঃ তিরমিযী, অধ্যায়ঃ ১৩, কিতাবুল আহকাম, অনুচ্ছেদঃ৩, বিচার কিভাবে ফায়সালা করবে, হাদিস নং ১৩২৭।

সূনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৩৫৯৪, সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং-১৩২৭, সুনানে দারেমী, হাদিস নং-১৬৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২২০৬১

#জবাবঃ
হাদিসটি ৩টি কারণে যইফ।

১) বর্ণনাকারী মুআয রাঃ এর সঙ্গীগণ মাজহুল।

২) সনদে হারেস ইবনুল আমর মাজহুল (অপরিচিত)

৩) হাদিসটি মুরসাল

* ইমাম বুখারী রহঃ বলেন, হাদিসটি সহীহ নয়।

* ইবনু হাযম বলেন, এ হাদিসটি বাতিল, এর কোন ভিত্তি নেই (আত-তালখীস, পৃষ্টা ৪০১)

#হাদীছটি সহীহ ধরলেও তা থেকে তাক্বলীদ প্রমাণিত হয় না।কারণঃ
১।হাদীছটি গভর্নর/কাযীর ফায়সালা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। মাযহাবী ফক্বিহগণ কোথায় গভর্ণর ছিলেন যে, তাদের ফায়সালা দেবার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছিল?
২।গভর্ণর ও কাযীদের ফায়সালা প্রদান আকস্মিক ও তাৎক্ষণিক বিষয়ে হয়ে থাকে।কাযীর তাৎক্ষণিক সিদ্বান্ত শরীয়াত নয়, শুধুমাত্র দৃষ্টান্ত হিসাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।অথচ মুকাল্লিদরা মুজতাহিদের ফতোয়াকে স্থায়ী শরীয়াতের মর্যাদা দিচ্ছে। শুধু তাই নয় এই ফতোয়া কিয়ামত পর্যন্ত মুকাল্লিদদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
৩।মুয়ায (রাঃ) এর তাক্বলীদ কি এখনও ইয়ামানে আছে?যদি না থাকে, তবে এ ঘটনা থেকে কোন মৃত ইমামের তাক্বলীদ কিভাবে প্রমাণ করা যায়?
———————————————-

#দলিল-১০ঃ হাদীছ যাচাই বাচাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের মুহাদ্দিসদের তাক্বলীদ করতে হয়।আসলে ইসলামের কোন শাখাই তাক্বলীদমুক্ত নয়।
#জবাবঃ
#যখন কোন মুহাদ্দিস কোন হাদীছকে সহীহ বা যয়ীফ হিসাবে গণ্য করেন, তখন এর মধ্যে কোন ধারণামুলক রায় থাকে না।তিনি কোন শরীয়াতের আইন নতুনভাবে সৃষ্টি করেন না যে, কোন ব্যক্তি ঐ কৃত্রিম শরীয়াত মেনে মুকাল্লিদে পরিণত হবে।বরং তিনি তো এই সাক্ষ্য দেন যে, অমুক রাবী যয়ীফ, তিনি এমন ছিলেন ইত্যাদি।আমরা তাদের উক্তিগুলোকে সত্য হিসাবে গ্রহণ করি।যেভাবে একজন বিচারক কোন সাক্ষীর সাক্ষ্য কবুল করেন। এ পর্যায়ে আমরা বিচারককে কি সাক্ষীর মুকাল্লিদ
বলব? কক্ষনো না।
#হাদীছের বর্ণণার নির্ভূলতা ও বিশুদ্বতা নির্ধারণে যেসকল পদ্বতিতে সাহাবীগণ (রাঃ) নীরিক্ষা চালাতেন মুহাদ্দিসগণ একই পদ্বতিগুলো ব্যবহার করেছেন। তারা নতুন কোন মূলনীতি প্রয়োগ করেন নি।(বিস্তারিত জানতে দেখুন-‘হাদীছের নামে জালিয়াতী’, খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর).
#হাদীছের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু একজন মুহাদ্দিসের উপর নির্ভর করা হয় না।তাই এখানে কোন একক ব্যক্তির তাক্বলীদের প্রশ্ন আসে না।যেমন নিচের বিষয়টি পরযালোচনা করলে পরিস্কার হবে-
কয়েকজন মুহাদ্দিস সহীহ হাদীছ সংকলনের চেষ্টা করেন।এদের মধ্যে ইমাম বুখারী, মুসলিম, আবদুল্লাহ ইবনু আলী ইবনুল জারুদ,ইবনু খুযাইমা,আহমদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনুস শারকী, কাসিম ইবনু ইউসুফ আল বাইয়ানী, সাইদ ইবনু উসমান, ইবনুস সাকান, ইবনু হিব্বান, ইবনু আবদুল্লাহ হাকিম নাসাইপুরী, ইবনু আবদুল ওয়াহিদ আল মাকদিসী রাহিঃ প্রমুখ শুধুমাত্র সহীহ হাদীছ সংকলনের চেষ্টা করে সহীহ গ্রন্থ রচনা করেন।(আর রিসালাতুল মুসতাতরাফা পৃঃ ২০-২৬)
কিন্তু পরবর্তীযুগের মুহাদ্দিসদের চুলচেরা নীরিক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র বুখারী ও মুসলিমের গ্রন্থদ্বয়ের সকল হাদীছ সহীহ বলে প্রমাণিত হয়েছে। বাকী কোন গ্রন্থেরই সকল হাদীছ সহীহ বলে প্রমাণিত হয় নি।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে সংকলিত সকল হাদীছ সহীহ বলে মেনে নেওয়ার কারণ এই নয় যে, ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদীছগুলোকে সহীহ বলেছেন।তাদের ব্যক্তিগত মর্যাদা এখানে মূল্যহীন।প্রকৃত বিষয় হল তাঁরা হাদীছগুলোকে সহীহ বলে দাবী করেছেন এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে মুহাদ্দিসগন তাদের সংকলিত হাদীছগুলোর সনদ যাচাই করেছেন এবং তাদের দাবীর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।
অতএব, এটা স্পষ্ট হল যে,মুহাদ্দিসগণের তাহকীক মেনে নেওয়া মানে তাদের তাক্বলীদ করা নয়।আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন।আমীন।

সহায়কগ্রন্থঃ
১।মাযহাব ও তাক্বলীদ -মাসউদ আহমেদ
২।হাদীছের নামে জালিয়াতী-খঃ আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর
৩।হাদীছের প্রামাণিকতা -ডঃ আসাদুল্লাহ আল গালিব


 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s