মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া কি শারী’আত সম্মত?

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া কি শারী’আত সম্মত?

উত্তর দিয়েছেনঃমুহাম্মাদ আকমাল হুসাইনলিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদী আরবএম, এ- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়দাঈ : সৌদী ধর্ম মন্ত্রণালয়

আমাদের সমাজে মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানী করা যাবে কি যাবে না মর্মে অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন। অতএব এ বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।ইসলামী শারী’আতের একটি নীতি হচ্ছে এই যে, যে কোন মুসলিম ব্যক্তি সাওয়াবের আশায় ইবাদাত হিসেবে কিছু করতে চাইলে অবশ্যই যা করতে চাচ্ছে তার সমর্থনে কুরআনের আয়াত অথবা সহীহ্ হাদীস থেকে দলীল থাকতে হবে। যদি সহীহ্ দলীল থাকে তাহলে তা করা যাবে আর যদি না থাকে তাহলে তা করা যাবে না। আর দলীল না থাকলেই তা নবাবিস্কার এবং বিদ’আত হিসেবে গণ্য হবে।এ রকমই একটি বিষয় হচ্ছে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে কি যাবে না এ বিষয়টি। আমরা যদি’ এর সমর্থনে দলীল অনুসন্ধান করতে যায় তাহলে দেখব যে, মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানী করা যাবে মর্মে কোন সহীহ্ দলীল পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি মৃত ব্যক্তির সাথে কুরবানীর কোন সম্পৃক্ততাই নেই।ইমাম আবূ দা’ঊদ এবং ইমাম তিরমিযী এ মর্মে দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন নিম্নে সে দু’টি নিয়ে আলোচনা করা হলো : ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﻋُﺜْﻤَﺎﻥُ ﺑْﻦُ ﺃَﺑِﻲ ﺷَﻴْﺒَﺔَ ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﺷَﺮِﻳﻚٌ ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﺍﻟْﺤَﺴْﻨَﺎﺀِ ﻋَﻦْ ﺍﻟْﺤَﻜَﻢِ ﻋَﻦْ ﺣَﻨَﺶٍ ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺃَﻳْﺖُ ﻋَﻠِﻴًّﺎ ﻳُﻀَﺤِّﻲ ﺑِﻜَﺒْﺸَﻴْﻦِ ﻓَﻘُﻠْﺖُ ﻟَﻪُ ﻣَﺎ ﻫَﺬَﺍ ﻓَﻘَﺎﻝَ ﺇِﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺃَﻭْﺻَﺎﻧِﻲ ﺃَﻥْ ﺃُﺿَﺤِّﻲَ ﻋَﻨْﻪُ ﻓَﺄَﻧَﺎ ﺃُﺿَﺤِّﻲ ﻋَﻨْﻪُ . �( ﺃﺑﻮﺩﺍﻭﺩ : ২৭৯০)ইমাম আবূ দাঊদ বলেন : আমাদেরকে উসমান ইবনু আবী শাইবাহ্ হাদীস বর্ণনা করে (শুনিয়েছেন), তিনি বলেন : আমাদেরকে শারীক হাদীস বর্ণনা করে (শুনিয়েছেন), তিনি আবুল হাসনা হতে, তিনি আল-হাকাম হতে, তিনি হানাশ হতে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেন : আমি আলী )ঃ(-কে দু’টি মেষ যাব্হ করতে দেখেছি। আমি তাকে বললাম এ কি? (অর্থাৎ দু’টি কেন?) তিনি উত্তরে বললেন : রসূল )ব ( আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করার জন্য অসিয়্যাত করে গেছেন। তাই আমি তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানী করছি। [হাদীসটি ইমাম আবূ দাঊদ (২৭৯০)[ http://sunnah.com/abudawud/16/3 ] বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি সহীহ্ নয়]।আর ইমাম তিরমিযীর ভাষাটি হচ্ছে নিম্নরূপ : ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﻣُﺤَﻤَّﺪُ ﺑْﻦُ ﻋُﺒَﻴْﺪٍ ﺍﻟْﻤُﺤَﺎﺭِﺑِﻲُّ ﺍﻟْﻜُﻮﻓِﻲُّ ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﺷَﺮِﻳﻚٌ ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﺍﻟْﺤَﺴْﻨَﺎﺀِ ﻋَﻦْ ﺍﻟْﺤَﻜَﻢِ ﻋَﻦْ ﺣَﻨَﺶٍ ﻋَﻦْ ﻋَﻠِﻲٍّ ﺃَﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﻀَﺤِّﻲ ﺑِﻜَﺒْﺸَﻴْﻦِ ﺃَﺣَﺪُﻫُﻤَﺎ ﻋَﻦْ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻭَﺍﻟْﺂﺧَﺮُ ﻋَﻦْ ﻧَﻔْﺴِﻪِ ﻓَﻘِﻴﻞَ ﻟَﻪُ ﻓَﻘَﺎﻝَ ﺃَﻣَﺮَﻧِﻲ ﺑِﻪِ ﻳَﻌْﻨِﻲ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲَّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻓَﻠَﺎ ﺃَﺩَﻋُﻪُ ﺃَﺑَﺪًﺍ .ইমাম তিরমিযী বলেন : আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবনু ওবাইদ মুহারিবী কূফী হাদীস বর্ণনা করে শুনিয়েছেন, তিনি বলেন : আমাদেরকে শারীক হাদীস বর্ণনা করে শুনিয়েছেন, তিনি আবুল হাসনা হতে, তিনি আল-হাকাম হতে, তিনি হানাশ হতে, তিনি আলী )ঃ( হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি (আলী) দু’টি মেষ কুরবানী দিতেন একটি নাবী )ব (-এর পক্ষ থেকে আর দ্বিতীয়টি তার নিজের পক্ষ থেকে। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : আমাকে নাবী )ব( তা করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন। অতএব আমি কখনও তা ছাড়ব না। [হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (১৪৯৫)[ http://sunnah.com/tirmidhi/19/3 ] বর্ণনা করেছেন]।ইমাম তিরমিযী বলেন : হাদীসটি গারীব। হাদীসটিকে একমাত্র শারীক কর্তৃক বর্ণনাকৃত হাদীস থেকেই জানতে পেরেছি। আবূ দাঊদ এবং তিরমিযী কর্তৃক বর্ণনাকৃত হাদীস দু’টিতে দু’জনের শাইখ (উস্তাদ) ভিন্ন হলেও সনদের উপরের বর্ণনাকারীগণ কিন্তু একই
। ﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤُﻨْﺬِﺭِﻱُّ : ﺣَﻨَﺶ ﻫُﻮَ ﺃَﺑُﻮ ﺍﻟْﻤُﻌْﺘَﻤِﺮ ﺍﻟْﻜِﻨَﺎﻧِﻲّ ﺍﻟﺼَّﻨْﻌَﺎﻧِﻲُّ، ﻭَﺃَﺧْﺮَﺟَﻪُ ﺍﻟﺘِّﺮْﻣِﺬِﻱّ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻏَﺮِﻳﺐ ﻟَﺎ ﻧَﻌْﺮِﻓﻪُ ﺇِﻟَّﺎ ﻣِﻦْ ﺣَﺪِﻳﺚ ﺷَﺮِﻳﻚ . ﻫَﺬَﺍ ﺁﺧِﺮ ﻛَﻠَﺎﻣﻪ . ﻭَﺣَﻨَﺶ ﺗَﻜَﻠَّﻢَ ﻓِﻴﻪِ ﻏَﻴْﺮ ﻭَﺍﺣِﺪ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍِﺑْﻦ ﺣِﺒَّﺎﻥ ﺍﻟْﺒُﺴْﺘِﻲّ : ﻭَﻛَﺎﻥَ ﻛَﺜِﻴﺮ ﺍﻟْﻮَﻫْﻢ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺧْﺒَﺎﺭ ﻳَﻨْﻔَﺮِﺩ ﻋَﻦْ ﻋَﻠِﻲّ ﺑِﺄَﺷْﻴَﺎﺀ ﻟَﺎ ﻳُﺸْﺒِﻪ ﺣَﺪِﻳﺚ ﺍﻟﺜِّﻘَﺎﺕ ﺣَﺘَّﻰ ﺻَﺎﺭَ ﻣِﻤَّﻦْ ﻟَﺎ ﻳُﺤْﺘَﺞّ ﺑِﻪِ . ﻭَﺷَﺮِﻳﻚ ﻫُﻮَ ﺍِﺑْﻦ ﻋَﺒْﺪ ﺍﻟﻠَّﻪ ﺍﻟْﻘَﺎﺿِﻲ ﻓِﻴﻪِ ﻣَﻘَﺎﻝ ﻭَﻗَﺪْ ﺃَﺧْﺮَﺝَ ﻟَﻪُ ﻣُﺴْﻠِﻢ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻤُﺘَﺎﺑَﻌَﺎﺕ .
হাফিয মুনযেরী বলেন : ‘হানাশ হচ্ছেন আবুল মু’তামির কিনানী সন’আনী। ইমাম তিরমিযী তার হাদীসটি বর্ণনা করে বলেছেন : হাদীসটি গারীব। হাদীসটিকে একমাত্র শারীক কর্তৃক বর্ণনাকৃত হাদীস থেকেই জানতে পেরেছি। এটি তার সম্পর্কে তিরমিযীর সর্বশেষ কথা। একাধিক ব্যক্তি (মুহাদ্দিস) বর্ণনাকারী হানাশের সমালোচনা করেছেন। ইবনু হিব্বান বুস্তী বলেন : তিনি হাদীসের ব্যাপারে খুবই সন্দেহ প্রবণ ছিলেন। তিনি আলী (রাযি)-এর উদ্ধৃতিতে কতিপয় হাদীস এককভাবে বর্ণনা করেছেন যেগুলো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীগণের হাদীসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। এভাবেই তিনি অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী হিসেবে গণ্য হয়ে যান। এছাড়া আরেক বর্ণনাকারী শারীক তিনি হচ্ছেন ইবনু আব্দিল্লাহ্ কাযী। তারও সমালোচনা করা হয়েছে। ইমাম মুসলিম তার থেকে বর্ণনা করেছেন শুধুমাত্র মুতাবা’আতের ক্ষেত্রে (তার স্থলে অন্য কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী হাদীসটি বর্ণনা করে থাকলে) এবং যৌথভাবে বর্ণনাকারী হিসেবে তার হাদীস গ্রহণ করেছেন। এককভাবে বর্ণনা করে থাকলে তার হাদীস গ্রহণ করেননি।’ [উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় দেখুন : তুহ্ফাতুল আহওয়াযী]।বর্ণনাকারী শারীকের শাইখ আবুল হাসনার নাম হচ্ছে হাসান অথবা হুসাইন। তার সম্পর্কে হাফিয
যাহাবী ”আল-মীযান” গ্রন্থে বলেন : হাকাম ইবনু ওতায়বাহ্ হতে তার বর্ণনা সম্পর্কে জানা যায় না। অর্থাৎ তিনি অপরিচিত (মাজহূল)। হাফিয ইবনু হাজার
”আত-তাক্বরীব” গ্রন্থে বলেন : তিনি মাজহূল।রসূল )ব( কর্তৃক অসিয়্যাত করা মর্মে ইমাম তিরমিযী এবং আবূ দাঊদ কর্তৃক বর্ণনাকৃত উক্ত হাদীসের সনদে তিন তিনজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। অতএব যখন হাদীসটি দুর্বল তখন এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা কোনক্রমেই সঠিক হতে পারে না।কোন কোন আলেম উক্ত হাদীসের দ্বারা দলীল গ্রহণ করে বলেছেন যে, যদি মৃত ব্যক্তি অসিয়্যাত করে যায় তাহলে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে। কিন্তু যেহেতু দুর্বল হওয়ার কারণে হাদীসটির দ্বারা দলীলই গ্রহণ করা যাচ্ছে না, তখন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানীর ব্যাপারে অসিয়্যাত করে যাওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হচ্ছে না। এরূপ কথা বললে তা দলীলনির্ভর কথা হবে না।তবে অসিয়্যাতের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভিত্তিক ‘আম হাদীসের কারণে মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে যদি তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার অসিয়্যাত করে যেয়ে থাকে তাহলে তার এক তৃতীয়াংশ সম্পদের মধ্য থেকে তা তার অভিভাবক বাস্তবায়ন করবে। তবে কুরবানী করার জন্য অসিয়্যাত করাকে সুন্নাত মনে করা যাবে না। কারণ এ মর্মে বর্ণিত হাদীসটি সহীহ্ নয়।মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে কি যাবে না মর্মে সৌদী আরবের বিশিষ্ট আলেমগণকে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন (ভাবার্থ)
:কুরবানী করা শারী’আত সম্মত শুধুমাত্র জীবিত মুসলিমদের ক্ষেত্রে। কারণ তাদের পক্ষ থেকেই কুরবানী করার বিষয়টি রসূল )ব (হতে বর্ণিত হয়েছে মৃত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে বর্ণিত হয়নি। তবে কেউ যদি মৃত্যুর পূর্বে অসিয়্যাত করে যায় তাহলে তার পক্ষ থেকে তার অভিভাবক বাস্তবায়ন করবে … এবং তা তার সম্পদের এক তৃতীয়াংশ থেকেই করবে।রসূল )ব (এর স্ত্রী খাদীজাহ্ মক্কাতে মারা গিয়েছিলেন এবং তাঁর তিন মেয়ে পরবর্তীতে মারা যান, তাঁর চাচা হামযাহ্ মারা যান কিন্তু তিনি তাদের কারো পক্ষ থেকেই কুরবানী করেননি। যদি এরূপ করা বিধিসম্মত হত তাহলে অবশ্যই তিনি তাঁর উম্মাতকে তা করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি আর এরূপ নির্দেশনা প্রদান না করাই প্রমাণ করছে যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা শারী’আত সম্মত নয়।যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা শারী’আত সম্মত হতো তাহলে রসূল )ব( সে সময়েই বলে দিতেন। কিন্তু তিনি তা বলে যাননি। অতএব মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করার প্রশ্নই আসে না। আর ইসলামী শারী’আতের ফিক্হ শাস্ত্রের একটি পরিভাষা হচ্ছে ﻻ ﻳﺠﻮﺯ ﺗﺄﺧﻴﺮ ﺍﻟﺒﻴﺎﻥ ﻋﻦ ﻭﻗﺖ ﺍﻟﺤﺎﺟﺔ . -লা ইয়াযূযু তা’খীরুল বায়ানে আন অকতিল হাজাতে- অর্থাৎ ‘প্রয়োজনের সময় থেকে দেরী করে ব্যাখ্যা আসা না-জায়েয’।তবে মৃত পিতা-মাতাকে নিজের কুরবানীর পশুর সাথে সাওয়াবে অংশীদার করার নিয়্যাত করাকে কোন কোন বিশিষ্ট আলেম জায়েয আখ্যা দিয়েছেন।
কিন্তু বাস্তবতা এই যে, ছেলে হোক আর মেয়ে হোক তারা কোন সৎকর্ম করে যে পরিমাণ সাওয়াব অর্জন করে এর সমপরিমাণ সাওয়াব পিতা এবং মাতাও পান। এ ক্ষেত্রে সন্তানের সাওয়াবে কোন প্রকার ঘাটতি করা হয় না। অতএব পিতা বা মাতার পক্ষ থেকে কুরবানীর নিয়্যাত করারই প্রয়োজন নেই। এ সম্পর্কে ”মৃত রোগ থেকে শুরু করে মৃত ব্যক্তি কেন্দ্রিক যাবতীয় করণীয় এবং বর্জনীয় বিষয়সমূহ” গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।এছাড়া নিম্নের হাদীস থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, একটি ছাগল এক ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে আদায় হয়
: ﻋَﻦْ ﻋَﻄَﺎﺀِ ﺑْﻦِ ﻳَﺴَﺎﺭٍ ﻳَﻘُﻮﻝُ : ﺳَﺄَﻟْﺖُ ﺃَﺑَﺎ ﺃَﻳُّﻮﺏَ ﺍﻟْﺄَﻧْﺼَﺎﺭِﻱَّ ﻛَﻴْﻒَ ﻛَﺎﻧَﺖْ ﺍﻟﻀَّﺤَﺎﻳَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻋَﻬْﺪِ ﺭَﺳُﻮﻝِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻓَﻘَﺎﻝَ : ﻛَﺎﻥَ ﺍﻟﺮَّﺟُﻞُ ﻳُﻀَﺤِّﻲ ﺑِﺎﻟﺸَّﺎﺓِ ﻋَﻨْﻪُ ﻭَﻋَﻦْ ﺃَﻫْﻞِ ﺑَﻴْﺘِﻪِ ﻓَﻴَﺄْﻛُﻠُﻮﻥَ ﻭَﻳُﻄْﻌِﻤُﻮﻥَ …)
.আতা ইবনু ইয়াসার হতে বর্ণিত তিনি বলেন : আমি আবূ আইঊব আনসারী )ঃ(-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম রসূল )ব (-এর যুগে কিভাবে কুরবানী করা হতো? উত্তরে তিনি বললেন : নাবী )ব( -এর যুগে এক ব্যক্তি একটি ছাগল কুরবানী করত নিজের এবং তার গৃহের সদস্যদের পক্ষ থেকে। অতঃপর নিজেরা খেতো এবং অন্যদেরকে খাওয়াতো …। [হাদীসটি সহীহ্, ”সহীহ্ তিরমিযী” (১৫০৫) ও ”সহীহ্ ইবনে মাজাহ্ (৩১৪৭)]।অতএব এ হাদীস থেকে স্পষ্ট হচ্ছে সাওয়াবে গৃহের অন্যান্য সদস্যরাও সম্পৃক্ত হবে। এ থেকে এরূপ বুঝা যায় না যে, মৃত পিতা বা মাতার নাম উল্লেখ করে নিয়্যাত করতে হবে কিংবা তাদের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে কুরবানী করলে গ্রহণযোগ্য হবে।কেউ কেউ নিম্নের হাদীসের দ্বারা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে মর্মে দলীল গ্রহণ করে থাকেন
: ﻋَﻦْ ﺟَﺎﺑِﺮِ ﺑْﻦِ ﻋَﺒْﺪِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻗَﺎﻝَ ﺷَﻬِﺪْﺕُ ﻣَﻊَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺍﻟْﺄَﺿْﺤَﻰ ﺑِﺎﻟْﻤُﺼَﻠَّﻰ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻗَﻀَﻰ ﺧُﻄْﺒَﺘَﻪُ ﻧَﺰَﻝَ ﻋَﻦْ ﻣِﻨْﺒَﺮِﻩِ ﻓَﺄُﺗِﻲَ ﺑِﻜَﺒْﺶٍ ﻓَﺬَﺑَﺤَﻪُ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺑِﻴَﺪِﻩِ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺑِﺴْﻢِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺍﻟﻠَّﻪُ ﺃَﻛْﺒَﺮُ ﻫَﺬَﺍ ﻋَﻨِّﻲ ﻭَﻋَﻤَّﻦْ ﻟَﻢْ ﻳُﻀَﺢِّ ﻣِﻦْ ﺃُﻣَّﺘِﻲ .
জাবের হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন : আমি রসূল )ব (-এর সাথে ঈদুূল আযহার মুসল্লায় উপস্থিত ছিলাম। তিনি যখন তাঁর খুদবাহ শেষ করলেন তখন তাঁর মিম্বার থেকে নামলেন। অতঃপর একটি মেষ নিয়ে আসা হলো। তিনি এটি আমার এবং আমার উম্মাতের যারা যাব্হ করেনি তাদের পক্ষ থেকে নিজ হাতে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে যাব্হ করলেন। [হাদীসটি তিরমিযী (১৫২১) আবূ দাঊদ (২৮১০) বর্ণনা করেছেন]।নিম্নের হাদীসটির দ্বারাও দলীল গ্রহণ করার চেষ্টা করা হয়
: ﻋَﻦْ ﻋَﺎﺋِﺸَﺔَ ﻭَﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﻫُﺮَﻳْﺮَﺓَ ﺃَﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥَ ﺇِﺫَﺍ ﺃَﺭَﺍﺩَ ﺃَﻥْ ﻳُﻀَﺤِّﻲَ ﺍﺷْﺘَﺮَﻯ ﻛَﺒْﺸَﻴْﻦِ ﻋَﻈِﻴﻤَﻴْﻦِ ﺳَﻤِﻴﻨَﻴْﻦِ ﺃَﻗْﺮَﻧَﻴْﻦِ ﺃَﻣْﻠَﺤَﻴْﻦِ ﻣَﻮْﺟُﻮﺀَﻳْﻦِ ﻓَﺬَﺑَﺢَ ﺃَﺣَﺪَﻫُﻤَﺎ ﻋَﻦْ ﺃُﻣَّﺘِﻪِ ﻟِﻤَﻦْ ﺷَﻬِﺪَ ﻟِﻠَّﻪِ ﺑِﺎﻟﺘَّﻮْﺣِﻴﺪِ ﻭَﺷَﻬِﺪَ ﻟَﻪُ ﺑِﺎﻟْﺒَﻠَﺎﻍِ ﻭَﺫَﺑَﺢَ ﺍﻟْﺂﺧَﺮَ ﻋَﻦْ ﻣُﺤَﻤَّﺪٍ ﻭَﻋَﻦْ ﺁﻝِ ﻣُﺤَﻤَّﺪٍ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ
আয়েশা ও আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত হয়েছে, রসূল )ব (যখন কুরবানী করার ইচ্ছা করতেন তখন বড়, মোটাসোটা, শিং বিশিষ্ট এবং কালো রংয়ের চেয়ে সাদার পরিমাণ বেশী এরূপ দু’টি খাসি করা মেষ ক্রয় করে একটি তাঁর উম্মাতের পক্ষ থেকে সেই ব্যক্তির জন্য যাব্হ করতেন যে আল্লাহর এক (এবং অদ্বিতীয়) হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছে এবং তিনি (মুহাম্মাদ) যে আল্লাহর বাণীকে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন এ সাক্ষ্য দিয়েছে তার জন্য। আর দ্বিতীয়টি মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদ (সঃ)-এর পরিবারের পক্ষ থেকে যাব্হ করতেন। [হাদীসটি সহীহ্ দেখুন ”সহীহ্ ইবনু মাজাহ্” (৩১২২)]।এ হাদীসে প্রমাণ মিলছে যে,
একটি মেষ এক ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে এবং সাওয়াবের ক্ষেত্রেও তারা সকলে অংশীদার হবে।আর রসূল )ব (তাঁর উম্মাতের যারা কুরবানী করেনি তাদের পক্ষ থেকে একটি মেষ কুরবানী করেছেন। উম্মাতের পক্ষ থেকে এরূপ মেষ কুরবানী করাটা তাঁর খাস ব্যাপার ছিল। এর উপর ভিত্তি করে অন্য কেউ মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করবেন তা হতে পারে না। কারণ যদি এরূপ করা জায়েযই থাকত তাহলে রসূল )ব ( এর মৃত্যুর পর চার খালীফা সহ অন্যান্য বিশিষ্ট সহাবীগণ হতে অবশ্যই তা সহীহ্ সূত্রে সাব্যস্ত হত। কিন্তু তাঁর সহাবীগণ মৃত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন মর্মে সহীহ্ সূত্রে এর কোন প্রমাণ মিলে না। অতএব তাঁর সুন্নাত হিসেবে সে যুগে যা করা হয়নি এ যুগে তা করা জায়েয হতে পারে না।আমাদের সমাজের মধ্যে কোন কোন ব্যক্তিকে এরূপ পাওয়া যায় সে নাবী )ব( এর নামে কুরবানী করছে এবং এরূপ কুরবানী করাকে তারা বিশেষ ফাযীলাতের মনে করছে। কিন্তু ইসলামী শারী’আতের মধ্যে কি এর কোন ভিত্তি আছে?না এরূপ করা যাবে না। এরূপ করা সম্পূর্ণরূপে বিদ’আতী কর্ম। ইসলামের প্রথমযুগে সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিমগণ নাবী )ব (-এর নামে কুরবানী করেছেন বলে প্রমাণ মিলে না।কেউ কেউ বলেছেন : যেমন পিতা-মাতার জন্য সন্তানের পক্ষ থেকে কিছু সাদাকা করা জায়েয আছে অনুরূপভাবে সাদাকার উপর কিয়াস করে কুরবানী করাও জায়েয আছে। সাদাকাহ্ হিসেবে এর সাওয়াব মৃত পিতা-মাতার নিকট পৌঁছবে।উল্লেখ্য পিতা-মাতার জন্য সাদাকা করলে তার সাওয়াব তাদের নিকট পৌঁছবে মর্মে একাধিক সহীহ্ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেসব হাদীসকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে কেউ যদি একটি গুরু বা ছাগল মৃত পিতা-মাতার নামে সাদাকাহ্ হিসেবে কোন মাদ্রাসা বা ইয়াতীম খানায় দান করে তাহলে এর সাওয়াব মৃত পিতা-মাতা পাবেন এতে কোন সন্দেহ্ নেই ইনশাআল্লাহ্। কিন্তু সে দলীলগুলোর তো কুরবানীর সাথে কোন প্রকার সম্পৃক্ততা নেই। কারণ, কুরবানী এমন একটি সতন্ত্র ইবাদাত এবং ইসলামী শারী’আতের এমন একটি বিধান যার সমর্থনে পৃথক দলীল বর্ণিত হয়েছে এবং জীবিত ব্যক্তিদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করবে না সে যেন মুসল্লার নিকটবর্তী না হয়।অতএব একটি সতন্ত্র জীবিতদের জন্য নির্ধারিত ইবাদাতকে মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত করতে হলে অবশ্যই মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত করে পৃথকভাবে সহীহ্ দলীল উপস্থাপন করতে হবে। অন্যথায় এরূপ কথা গ্রহণযোগ্য হবে না। যে ইবাদাত যাকে সম্বোধন করে বর্ণিত হয়নি সে ইবাদাতকে তার সাথে কিয়াস করে সম্পৃক্ত করে দেয়া মোটেই যৌক্তিক নয়। বরং এরূপ কিয়াস হচ্ছে নীতি বিরোধী অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য কিয়াস।ইসলামের প্রথম যুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম নাবী )ব (-এর সহাবীগণ তো এরূপ কিয়াস করে মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করেননি। রসূল )ব (এর পক্ষ থেকে সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ সে যুগের মুসলিমগণ (সহাবীগণ) কি কম বুঝতেন? (নাউযুবিল্লাহ্)।তাদের থেকে সহীহ্ সূত্রে এরূপ আমল প্রমাণিত না হওয়াটাই প্রমাণ করছে যে,
মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানী করা যাবে না। কেউ করলে তা দলীলহীন আমল হিসেবে গণ্য হবে যা সম্পূর্ণরূপে ইসলামী নীতি বিরোধী।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s