কুরআন ও সুন্নাহ’র আলোকে তাগুত

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম « আগের সংবাদ

তাগুত সম্পকে কুরআনের আয়াত
وَالَّذِينَ اجْتَنَبُوا الطَّاغُوتَ أَن يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوا إِلَى اللَّهِ لَهُمُ الْبُشْرَىٰ ۚ فَبَشِّرْ عِبَادِ [٣٩:١٧]
যারা তাগুতের (শয়তানী) শক্তির পূজা-অর্চনা থেকে দূরে থাকে এবং আল্লাহ অভিমুখী হয়, তাদের জন্যে রয়েছে সুসংবাদ। অতএব, সুসংবাদ দিন আমার বান্দাদেরকে।
(সুরা যুমার-৩৯, অায়াত-১৭)
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَٰؤُلَاءِ أَهْدَىٰ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا [٤:٥١]
তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, যারা মান্য করে প্রতিমা ও শয়তানকে এবং কাফেরদেরকে বলে যে, এরা মুসলমানদের তুলনায় অধিকতর সরল সঠিক পথে রয়েছে।
(সুরা নিসা-৪, অায়াত-৫১)
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا [٤:٦٠]
আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবর্তীণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।
(সুরা নিসা-৪, অায়াত-৬০)
۞ فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ ۚ وَمَن يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا [٤:٧٤]
কাজেই আল্লাহর কাছে যারা পার্থিব জীবনকে আখেরাতের পরিবর্তে বিক্রি করে দেয় তাদের জেহাদ করাই কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা আল্লাহর রাহে লড়াই করে এবং অতঃপর মৃত্যুবরণ করে কিংবা বিজয় অর্জন করে, আমি তাদেরকে মহাপুণ্য দান করব।
(সুরা নিসা-৪, অায়াত-৭৬)
এ-কথা জানা প্রয়োজন যে, আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির উপর সর্ব প্রথম যা ফরজ করেছেন তা হচ্ছে তাগুতের সাথে কুফরি এবং আল্লাহর উপর ঈমান।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “আর নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি এ কথা বলে যে, তোমরা শুধু আল্লাহর উপাসনা কর এবং তাগুতকে পরিত্যাগ কর।” [সূরা আন্-নাহল: ৩৬]
তাগুতের সাথে কুফরির ধরণ হলো : আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর উপাসনা (ইবাদত) বাতিল বলে বিশ্বাস করা, তা ত্যাগ করা, ঘৃণা ও অপছন্দ করা, এবং যারা তা করবে তাদের অস্বীকার করা, তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা।
আর আল্লাহর উপর ঈমানের অর্থ হলো : আল্লাহ তা‘আলাই কেবলমাত্র হক উপাস্য ইলাহ, অন্য কেউ নয়— এ-কথা বিশ্বাস করা, আর সবরকম ইবাদতকে নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট করা যাতে এর কোন অংশ অন্য কোন উপাস্যের জন্য নির্দিষ্ট না হয়; আর মুখলিস বা নিষ্ঠাবানদের ভালবাসা, তাদের মাঝে আনুগত্যের সম্পর্ক স্থাপন করা, মুশরিকদের ঘৃণা ও অপছন্দ করা, তাদের শত্রুতা করা।
আর এটাই ইবরাহীম আলাইহিস্‌সালাম এর প্রতিষ্ঠিত দীন বা মিল্লাত, যে ব্যক্তি তার থেকে বিমুখ হবে সে নিজ আত্মাকে বোকা বানাবে, আর এটাই হলো সে আদর্শ (أسوة) বা (Model) যার কথা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণীতে বলেছেন : “অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে ইবরাহীম ও তার সাথীদের মাঝে সুন্দর আদর্শ, যখন তারা তাদের জাতিকে বলেছিল: আমরা তোমাদের এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের অপরাপর উপাস্য দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণ সম্পর্কমুক্ত, আমরা তোমাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলাম, আর আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরদিনের জন্য শত্রুতা ও ঘৃণার সম্পর্ক প্রকাশ হয়ে পড়ল, যে পর্যন্ত তোমরা শুধু এক আল্লাহর উপর ঈমান স্থাপন না করছ।” [সূরা আল-মুমতাহিনাঃ ৪]
তাগুত:
শব্দটি ব্যাপক, এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত যা কিছুর ইবাদত বা উপাসনা করা হয়, এবং উপাস্য সে উপাসনায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে এমন সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে, চাই কি তা দেবতা, বা নেতা, বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণের বাইরে অন্য কারো অনুসরণই হোক, ঐসবগুলোকেই তাগুত বলা হবে।
আল্লাহ তাআ’লা মানুষের প্রতি প্রথম যে আদেশ করেছেন সেটা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, অর্থাৎ তাওহীদ প্রতিষ্ঠ করা এবং সমস্ত প্রকার তাগুত থেকে বেঁচে থাকার জন্য।
পবিত্র কুরআনে সূরা আন-নাহলের ৩৬নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানুতালা বর্ননা করেছেনঃ-
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُواْ اللّهَ وَاجْتَنِبُواْ الطَّاغُوتَ
“আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক”। সুরা আন-নাহলঃ ৩৬।
আল্লাহ তাআ’লা এই আদেশ সমস্ত নবী ও তাদের উম্মতকেই করেছেন। অধিকন্তু আরও বিস্তারিতভাবে বলা যায় যে, মহান আল্লাহ বান্দার উপর ফরয করেছেন যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা হয়, এবং এটাই হলো সেই তাওহীদ যা ছিল সকল নবীগণের (عليهم السلام) দাওয়াতের মূল বিষয়।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আমার ইবাদত করার জন্যই আমি জিন ও মানব জাতি সৃষ্টি করেছি।” (সূরা যারিয়াত: ৫৬)
আর “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” হলো পবিত্র কালিমা তাওহীদ যার উপর ভিত্তি করে টিকে থাকে দ্বীন ইসলাম। একথা জানা প্রয়োজন যে, আল্লাহ তাআলা মানব জাতির উপর সর্বপ্রথম যা ফরয করেছেন তা হচ্ছে তাগুতের সাথে কুফরী এবং আল্লাহর উপর ঈমান।
অর্থাৎ, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর রুকন বা ভিত্তি দু’টো যা নিম্নে উপস্থাপন করা হলোঃ-
১। কুফর বিত্ তাগুত
২। ঈমান বিল্লাহ
আল্লাহ সুবহানুতালা পবিত্র কুরআনে তাই এ প্রসঙ্গে সূরা বাকারায় ২৫৬নং আয়াতে বলেছেনঃ-
فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىَ لاَ انفِصَامَ لَهَا وَاللّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“সুতরাং যে তাগুতের সাথে কুফরী করে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনে সে এমন মজবুত রজ্জুকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে যার কোন বিভক্তি বা চিড় নেই, আর আল্লাহ সর্ব শ্রোতা ও সর্ব জ্ঞানী।” (সূরা বাকারা: ২৫৬)।
তাগুতের সাথে কুফরীর ধরন হলো:
“লা ইলাহা”—“নেই কোন ইলাহ” বাক্যটি নেতিবাচক; অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর উপাসনা (ইবাদত) বাতিল বলে বিশ্বাস করা, তা ত্যাগ করা, ঘৃণা ও অপছন্দ করা, এবং যারা তা (আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনকিছুর উপাসনা) করবে তাদের অস্বীকার করা, তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা।
আল্লামা ইদরিস কান্ধলবি আল হানাফী (رحيمه الله) বলেন, “হযরত (صلي الله عليه و سلم) এর কুফর ও শিরক বিরোধী প্রকাশ্য ঘোষনা এবং মূর্তি ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে ঘৃণার দরুন তাঁর ও তাঁর সাহাবাদের (رضي الله عنهم) তীব্র শত্রুতা ও বিরোধীতার মুখে অটল থাকা এ বিষয়েরই প্রকাশ্য প্রমাণ যে, ঈমান এবং ইসলামের জন্য কেবল অন্তরে সত্যায়ন অথবা মৌখিক স্বীকৃতিই যথেষ্ট নয়, বরং কুফর ও কাফের এবং শিরকের বৈশিষ্ট্য ও আনুষঙ্গিকতার বিরোধীতাও জরুরি এবং সেগুলো অপছন্দ করাও অত্যাবশ্যক।” (সিরাতে মুস্তফা সাঃ, ১/১৫৫)
তিনি (رحيمه الله) আরও বলেন, “মহান পয়গম্বর (عليهم السلام) গণের সুন্নাহ তথা আদর্শ তো এটাই যে, যেভাবে তাঁরা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর প্রতি ইমান ও সত্যায়নের আহবান জানান, ঠিক তেমনিভাবে কুফর, শিরক ও তাগুতকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করা ও অস্বীকারের আহবান জানান।” (সিরাতে মুস্তফা সাঃ, ১/১৫৬)
আর আল্লাহর উপর ঈমানের অর্থ হলো:
দ্বিতীয় রুকন ‘ইল্লাল্লাহ’ হলো ইতিবাচক। অর্থাৎ শিরকমুক্ত শুধুমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠার অংগীকার।
আল্লাহ তাআলাই কেবলমাত্র হক উপাস্য ও ইলাহ, অন্য কেউ নয়—একথা বিশ্বাস করা, আর সবরকম ইবাদতকে নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট করা যাতে এর কোন অংশ অন্য কোন উপাস্যের জন্য নির্দিষ্ট না হয়; আর মুখলিস বা নিষ্ঠাবানদের ভালবাসা, তাদের সাথে আনুগত্যের সম্পর্ক স্থাপন করা, মুশরিকদের ঘৃণা ও অপছন্দ করা, তাদের সাথে শত্রুতা করা।
আর এটাই হলো ইবরাহীম (عليه السلام) এর প্রতিষ্ঠিত দ্বীন বা মিল্লাত, যে ব্যক্তি এর থেকে বিমুখ হবে সে তো স্বয়ং নিজেকেই বোকা বানাবে, আর এটাই হলো সে আদর্শ (أسوة) যার কথা আল্লাহ তাআলা তাঁর বাণীতে বলেছেন:
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَاء مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاء أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ
“তোমাদের জন্যে ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তাঁরা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলেন: তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করো, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা বজায় থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো।” (সূরা মুমতাহিনা: ৪)
কিন্তু প্রশ্ন হলোঃ তাগুত কি? তাগুত কারা? আমরা যদি তাগুত চিনবো কি করে?
>>>> তাগুত এর সংজ্ঞা – তাগুত এর আভিধানিক সংজ্ঞা <<<<
>>>> তাগুতের শাব্দিক বিশ্লেষন <<<<
তাগুত শব্দের অর্থ হচ্ছে সীমালংঘনকারী, আল্লাহদ্রোহী, বিপথে পরিচালনাকারী। তাগুত শব্দটি আরবী (তুগইয়ান) শব্দ থেকে উৎসারিত, যার অর্থ সীমালংঘন করা, বাড়াবাড়ি করা, স্বেচ্ছাচারিতা। অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, তাগুত শব্দ এসেছে “তাগা” যার অর্থ “সীমা লংঘন করা”, আল্লাহ ছাড়া যা কিছুর উপাসনা করা হয় এবং যে এতে রাজি-খুশি থাকে, তাকে তাগুত বলা হয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানুতালা তাগুত সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছেন যা নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ-
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُواْ نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُواْ هَؤُلاء أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آمَنُواْ سَبِيلاً
“তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, যারা মান্য করে জিবত ও তাগুতকে এবং কাফেরদেরকে বলে যে, এরা মুসলমানদের তুলনায় অধিকতর সরল সঠিক পথে রয়েছে।” (সূরা নিসা: ৫১)।
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُواْ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُواْ إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُواْ أَن يَكْفُرُواْ بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلاَلاً بَعِيدًا
“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে হয়েছে সে বিষয়ের উপর তারা ঈমান এনেছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যেন তাকে অস্বীকার করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।” (সূরা নিসা: ৬০)।
الَّذِينَ آمَنُواْ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُواْ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُواْ أَوْلِيَاء الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا
“যারা ঈমানদার তারা যে জিহাদ করে আল্লাহর রাহেই। পক্ষান্তরে যারা কাফের তারা লড়াই করে তাগুতের পক্ষে। সুতরাং তোমরা জিহাদ করতে থাকো শয়তানের পক্ষাবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে, (দেখবে) শয়তানের চক্রান্ত একান্তই দুর্বল।” (সূরা নিসা: ৭৬)।
>>>> তাগুত শব্দের শর‘য়ী সংজ্ঞা <<<<
উমর (رضي الله عنه) বলেন, “জিবত শব্দের অর্থ হচ্ছে যাদু এবং তাগুত শব্দের অর্থ হচ্ছে শয়তান।” (তাফসীরে ইবন কাসির-২/৪৪৪, সূরা নিসা: ৫১ এর তাফসীর, তাফসীরে মা‘আরিফুল কুরআন: ২/৪১৩)
জাবির (رضي الله عنه) তাগুত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেন, “তারা ছিলো যাদুকর এবং তাদের কাছে শয়তান আসতো।” (তাফসীরে ইবন কাসির-২/৪৪৪, সূরা নিসা: ৫১ এর তাফসীর)
মুজাহিদ (رحيمه الله) বলেন, “তারা হচ্ছে মানুষরূপী শয়তান। তাদের কাছে মানুষ তাদের বিবাদ নিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে বিচারক মেনে নেয়।” (তাফসীরে ইবন কাসির-২/৪৪৪, সূরা নিসা: ৫১ এর তাফসীর)
ইমাম মালেক (رحيمه الله) তাগুতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন: “আল্লাহ তাআলাকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়, এমন প্রত্যেক জিনিসকেই তাগুত বলা হয়।” (ফতহুল ক্বাদীর, আল্লামা শওক্বানী)
ইমাম ইবনে জারির তাবারি আশ-শাফেয়ী (رحيمه الله) বলেন, “আমাদের মতে সঠিক মত হলো, আল্লাহর উপর সীমালংঘনকারী মাত্রই তাগুত বলে চিহ্নিত, যার অধীনস্থ ব্যক্তিরা চাপের মুখে বা তাকে তোষামোদ করার জন্য বা তার আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য তার ইবাদত করে। এ (তাগুত) উপাস্যটি মানুষ কিংবা শয়তান কিংবা মূর্তি কিংবা প্রতিমা অথবা অন্য যেকোন কিছুর হতে পারে।” (তাফসীর আত্ তাবারি, ইসলামি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৫ম খন্ড, সূরা বাকারা: ২৫৬ নং আয়াতের তাফসীর)
ইমাম ইবন জারির তাবারি আশ-শাফেয়ী (رحيمه الله) বলেন, “ঐ সকল আল্লাহদ্রোহী যারা আল্লাহর নাফরমানী করে সীমালংঘন করেছে এবং মানুষ যাদের আনুগত্য করে। সে মানুষ, জ্বিন, শয়তান, প্রতিমা বা অন্য কিছুও হতে পারে।” (তাফসীর আত্ তাবারি: ৩/২১)
ইমাম নববী আশ-শাফেয়ী (رحيمه الله) বলেন, “আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদাত করা হয় তারাই তাগুত। এটাই লাইস, আবু উবাইদা, কেসায়ি এবং বেশীরভাগ আরবী ভাষাবিদদের অভিমত।” (শরহে মুসলিম: ৩/১৮)
ইমাম কুরতুবি আল-মালেকী (رحيمه الله) বলেন, “তাগুত হচ্ছে গণক, যাদুকর, শয়তান এবং পথভ্রষ্ট সকল নেতা।” (আল-জামে লি আহকামিল কুরআন: ৩/২৮২)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া আল-হাম্বলী (رحيمه الله) বলেন, “আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদাত করা হয় তারাই তাগুত, যদি তারা তাদের এই ইবাদতে অসন্তুষ্ট না হয়। এ কারণেই আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (صلي الله عليه و سلم) মূর্তিকে তাগুত বলেছেন।” (মাজমাআতুল ফাতাওয়া: ২৮/২০০)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া আল-হাম্বলী (رحيمه الله) বলেন, “আল্লাহর কিতাব ছাড়া যার কাছে বিচার ফায়সালা চাওয়া হয়, তাকেই তাগুত নামে আখ্যায়িত করা হয়।” (মাজমাআতুল ফাতাওয়া: ৭০১/৭৮)
ইমাম ইবনে কাসীর আশ-শাফেয়ী (رحيمه الله) বলেন, “হযরত উমরের (رضي الله عنه) তাগুতের অর্থ শয়তান নেয়া যথার্থই হয়েছে। কেননা সমস্ত খারাপ কাজই এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যেগুলো অজ্ঞতার যুগের লোকদের মাঝে বিদ্যমান ছিল। যেমন প্রতিমার পূজা, তাদের কাছে অভাব-অভিযোগ পেশ করা এবং বিপদের সময় তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া ইত্যাদি।” (তাফসীর ইবনে কাসির ১/৭১৪, সূরা বাকারা: ২৫৬ এর তাফসীর)
ইমাম ইবনে কাসীর আশ-শাফেয়ী (رحيمه الله) বলেন, “এ আয়াত প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির দুর্নাম ও নিন্দা করছে, যে কিতাব ও সুন্নাহকে ছেড়ে অন্য কোন বাতিলের দিকে স্বীয় ফায়সালা নিয়ে যায়। এখানে এটাই হচ্ছে তাগুতের ভাবার্থ।” (তাফসীর ইবনে কাসির ২/৪৬৩, নিসা: ৬০ এর তাফসীর)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-হাম্বলী (رحيمه الله) বলেন, “তাগুত হচ্ছে এমন যে কেউ যার প্রতি বান্দা (আবদ) সীমালংঘন করে, সেটা কাউকে ইবাদত করা (মা’বুদিন) বা অনুসরণ করা (মাতবুইন) বা মান্য করা (মুতাইন) যাই হোক না কেন।” (ই’লামুল মুওয়াক্কিইন)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-হাম্বলী (رحيمه الله) বলেন, “তাগুত হচ্ছে ঐ সকল মা’বুদ, নেতা, মুরব্বি যাদের আনুগত্য করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করা হয়। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে বাদ দিয়ে যাদের কাছে বিচার ফায়সালা চাওয়া হয়, অথবা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদাত করা হয়, অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন দলিল-প্রমাণ ছাড়া যাদের আনুগত্য করা হয় এরাই হলো পৃথিবীর বড় বড় তাগুত। তুমি যদি এই তাগুতগুলো এবং মানুষের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করো তবে বেশীরভাগ মানুষকেই পাবে যারা আল্লাহর ইবাদতের পরিবর্তে তাগুতের ইবাদত করে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের কাছে বিচার-ফায়সালা চাওয়ার পরিবর্তে তাগুতের কাছে বিচার-ফায়সালা নিয়ে যায়। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার পরিবর্তে তাগুতের আনুগত্য করে।” (ই’লামুল মুওয়াক্কিইন: ১/৫০)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-হাম্বলী (رحيمه الله) তাগুতকে ৫ টি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন,
১. শাইতন বা শয়তান
২. যার ইবাদত/উপাসনা/পূজা করা হয় এবং সে এটি নিয়ে সন্তুষ্ট।
৩. যে অপরকে তার ইবাদাত/উপাসনা/পূজা করতে আহবান করে বা ডাকে।
৪. যে গায়েব বা অদৃশ্য-এর জ্ঞান জানার দাবি করে।
৫. যে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ব্যতীত অন্য কিছু দিয়ে শাসন করে। (মাদারিজুস-সালিকিন )
শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব আল-হাম্বলী (رحيمه الله) বলেন, “তাগুত হচ্ছে ঐ সকল মা’বুদ, নেতা, মুরব্বি, আল্লাহর পরিবর্তে যাদের আনুগত্য করা হয় এবং তারা এতে সন্তুষ্ট থাকে।” (মাজমাআতুত-তাওহীদ: ৯)
শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব আল-হাম্বলী (رحيمه الله) তাগুতকে ৫ টি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন, কিন্তু ৫ম ভাগটিতে পার্থক্য রয়েছেঃ-
১. শাইতন বা শয়তান
২. যে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ব্যতীত অপর কিছু দিয়ে বিচার করে।
৩. যে আল্লাহ্র পাশাপাশি গইব বা অদৃশ্যের জ্ঞানের দাবি করে।
৪. যার ইবাদাত/উপাসনা/পূজা করা হয় এবং সে এটি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে।
৫. সেই অত্যাচারী বিচারক, যে আল্লাহ্র বিচারে পরিবর্তন করে। (আদ-দারার আস-সুন্নিয়্যাহ, ভলিউম: ০১, পৃষ্ঠা: ১০৯-১১০)
আল্লামা শাব্বির আহমাদ উসমানি আল-হানাফী (رحيمه الله) বলেন, “হযরত শাহ সাহেব [মাওলানা শাহ আব্দুল কাদির দেহলাবি আল-হানাফী (رحيمه الله)] বলেন, “তাগুত হচ্ছে তারা, যারা ভিত্তিহীনভাবে নের্তৃত্বের দাবি করে। প্রতিমা, শয়তান, স্বেচ্ছাচারী শাসক সবই এর অন্তর্ভুক্ত।” (তাফসীরে উসমানিঃ২/৫৪৫)
মুফতি মুহাম্মাদ শফি আল-হানাফী (رحيمه الله) বলেন, “তাগুত শব্দের অর্থ ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী। আর প্রচলিত অর্থে ‘তাগুত’ বলা হয় শয়তানকে। এ আয়াতে বিরোধীয় বিষয়টিকে কা‘ব ইবনে আশরাফের কাছে নিয়ে যাওয়াকে শয়তানের কাছে নিয়ে যাওয়া সাব্যস্ত করা হয়েছে। তা হয় এই কারণে যে, কা‘ব নিজেই ছিল শয়তান কিংবা এই কারণে যে, শরীয়তের ফায়সালা বর্জন করে শরীয়তবিরোধী মীমাংসার দিকে ধাবিত হওয়া, শয়তানেরই শিক্ষা হতে পারে। বস্তুত যে লোক সেই শিক্ষার অনুসরণ করেছে, শয়তানের কাছেই সে যেন নিজের মোকাদ্দমা নিয়ে গেছে।” (তাফসীরে মা‘আরিফুল কুরআন: ২/৪৩৯-৪৪০)
উস্তাদ সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ আশ-শাফেয়ী (رحيمه الله) বলেন, “তাগুত বলতে সেইসব ব্যক্তি ও ব্যবস্থাকে বোঝায় যেগুলো ঐশী দ্বীন এবং নৈতিক, সামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলাকে অবমাননা করে এবং আল্লাহ নির্দেশিত বা তাঁর দেয়া দিক-নির্দেশনা থেকে উদ্ভূত নয় এমন সব মূল্যবোধ ও রীতিনীতির ভিত্তিতে জীবনব্যবস্থা পরিচালনা করে।” (তাফসীরে ফী যিলালিল কোরআন)
উস্তাদ সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ আশ-শাফেয়ী (رحيمه الله) বলেন, “যারা সত্যকে অমান্য করে, ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর দেয়া সীমারেখা অতিক্রম করে, আল্লাহর দেয়া শরীয়তের কোন তোয়াক্কা করে না, ইসলামি আক্বীদাহ-বিশ্বাসের কোন গুরুত্ব রাখে না, যারা ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত পদ্ধতি বাদ দিয়ে অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুমোদন ছাড়া ইবাদতের পদ্ধতি তৈরি করে, যারা বিশেষ প্রকার ধ্যান করা অথবা বিশেষ ভঙ্গিমা অথবা কোন ইবাদতের বিশেষ আদব তৈরি করে তারা সকলেই তাগুত। এমনিভাবে যারা বিশেষ কোন ব্যক্তির অন্ধ অনুকরণে জনসাধারণকে বাধ্য করে তারাও তাগুত।” (তাফসীরে ফী যিলালিল কোরআন: ১/২৯২)
শাইখ মুহাম্মাদ আমিন শানকিত্বি আল-মালেকী (رحيمه الله) বলেন, “আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদাত করা হয় তারাই তাগুত। আর এই গাইরুল্লাহর ইবাদতের বড় অংশটাই হচ্ছে শয়তানের জন্য। কেননা শয়তানের আহবানে সাড়া দিয়ে কোন গাইরুল্লাহর ইবাদাত করা পরোক্ষভাবে শয়তানেরই ইবাদতের শামিল। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘হে বনী আদম! আমি কি তোমাদের বলে রাখিনি যে শয়তানের ইবাদাত করোনা?’ (সূরা ইয়াসিন: ৬০)” (তাফসীরে আদওয়াউল বয়ান: ১/২২৮)
মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক আল-হানাফী (دابت بركته) বলেন, “তাগূতের অর্থ আল্লাহর ঐ বিদ্রোহী বান্দা, যে আল্লাহর মোকাবেলায় নিজেকে বিধানদাতা মনে করে এবং মানুষের উপর তা কার্যকর করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে কোন তাগুত ব্যক্তি বা দলের বানানো আইন-কানুন হচ্ছে সত্য দ্বীন ইসলামের বিপরীতে বিভিন্ন ‘ধর্ম’, যা থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করা ছাড়া ঈমান সাব্যস্ত হয়না। আল্লাহর বিরুদ্ধে কিংবা আল্লাহর উপাসনার পাশাপাশি তাগুতের উপাসনা বা আনুগত্য করা কিংবা তা বৈধ মনে করা, তদ্রুপ আল্লাহর দ্বীনের মোকাবেলায় বা তার সাথে তাগূতের আইন-কানুন গ্রহণ করা বা গ্রহণ করাকে বৈধ মনে করা সরাসরি কুফর ও শিরক। তাগূত ও তার বিধি-বিধান থেকে সম্পর্কচ্ছেদ ছাড়া ঈমানের দাবি নিফাক ও মুনাফিকী।” (ঈমান সবার আগে-৩, মাসিক আল-কাউসার মে-২০১৩)
মাওলানা মুহাম্মাদ মাসঊদ আযহার আল-হানাফী (دابت بركته) বলেন,
১। ইসলাম বিরোধী প্রত্যেক শক্তির নামই তাগুত।
২। তাছাড়া, তাগুত হলো সেইসব ব্যক্তি যারা মানুষকে সত্য দ্বীন থেকে বিপথগামী করে-হোক সে মানুষ অথবা জ্বীন।
৩। যারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে-সেই ধরনের প্রত্যেক ব্যক্তিই তাগুত।
৪। তাগুত হলো সেইসব সিস্টেম বা পদ্ধতি যার ছত্রছায়ায় কুচক্রী মানুষগুলো একত্রিত হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষরযন্ত্রে লিপ্ত থাকে অথবা যুদ্ধ করে।
৫। আরো, তাগুত হচ্ছে সেইসব প্রতিষ্ঠানের নাম যেখানে সত্য দ্বীন বিরোধী নিত্য-নতুন বিভাগ ও ফিরকার উদ্ভব ঘটে।
৬। শয়তান এবং মিথ্যা উপাস্যগুলোকে (হোক মানুষ অথবা জ্বিন) তাগুতের প্রধান অর্থ বুঝালেও, এর পাশাপাশি তাগুত হচ্ছে পৃথিবীর সেইসকল ক্ষমতাসীন মানুষ যারা তাদের সমস্ত বাতিল শক্তির মাধ্যমে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে, ইসলামি শরীয়তের আইনের বাস্তবায়নকে রুদ্ধ করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের সাহায্য করে। (আল্লাহই ভালো জানেন) (ফাতহুল জাওয়াদ ফী মা’আরিফ আয়াতুল জিহাদ, পৃ: ৩৭৫-৩৭৬)
মনে রাখা দরকার কোন মানুষ তাগুতের উপর কুফরী ছাড়া ইমানদার হতে পারেনা।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাই বলেছেন:
فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىَ لاَ انفِصَامَ لَهَا وَاللّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“সুতরাং যে তাগুতের সাথে কুফরী করে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনে সে এমন মজবুত রজ্জুকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে যার কোন বিভক্তি বা চিড় নেই, আর আল্লাহ সর্ব শ্রোতা ও সর্ব জ্ঞানী।” (সূরা বাকারা: ২৫৬)
এ আয়াতের পূর্বাংশে আল্লাহ বলেছেন, “বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন পথ, ভ্রান্ত-পথ থেকে স্পষ্ট হয়েছে।” “বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন পথ” বলতে রাসূল (صلي الله عليه و سلم) এর দ্বীনকে, আর “ভ্রান্ত-পথ” বলতে আবু জাহলের দ্বীনকে বুঝানো হয়েছে, আর এর পরবর্তী আয়াতের মজবুত রশি বা রজ্জু দ্বারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (আল্লাহ ছাড়া কোন হক উপাস্য নেই) এর সাক্ষ্য প্রদানকে বুঝিয়েছেন।
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এই কালিমা কিছু জিনিসকে নিষেধ করে, এবং কিছু বস্তুকে সাব্যস্ত করে; সকল প্রকার ইবাদতকে আল্লাহর ছাড়া অন্যের জন্য নির্ধারিত হওয়াকে নিষেধ করে। শুধুমাত্র লা-শরীক আল্লাহর জন্য সকল প্রকার ইবাদতকে নির্দিষ্ট করে। আল্লাহর জন্যই সমস্ত শোকর, যার নেয়ামত ও অনুগ্রহেই যাবতীয় ভাল কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে।
>>>> তাগুত সম্বন্ধে আলোচনা <<<<
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তাগুত সম্বন্ধে আরও বিস্তারিত বর্ননা উপস্থাপন করা হলোঃ-
তাগুত অনেক প্রকারের আছে তার থেকে প্রধান ৫ প্রকার উল্লেখ করা হলোঃ
১. ইবলিশঃ সে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদতের দিকে আহব্বান করে।
“হে বনী-আদম! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, শয়তানের এবাদত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? এবং আমার এবাদত কর। এটাই সরল পথ।” সুরা ইয়াসিনঃ ৬০-৬১।
সুতরাং আল্লাহ ছাড়া যাকিছুর উপাসনা করা হয় এর মূলে রয়েছে ইবলিশ। সেই হচ্ছে সমস্ত শিরকের হোতা।
২. আল্লাহর আইন বিরোধী অত্যাচারী শাসকঃ যে আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করে দেয় এবং মানুষের বানানো শাসনতন্ত্র কায়েম করে। যেমন কেউ যদি বলে, “চোরের শাস্তি হাত কাটা বর্বরতা, হত্যার শাস্তি (কেসাস), জিনার শাস্তি (রজম) বর্তমান যুগে চলবেনা”
আল্লাহ সুবহানুতালা পবিত্র কুরআনে তাগুত সম্বন্ধে কি বলেছেন তা নিম্নে উপস্থাপন করা হলোঃ-
“হে ঈমানদারগন! তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কেসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তির বদলায়, দাস দাসের বদলায় এবং নারী নারীর বদলায়। অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেয়া হয়, তবে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে সহজ এবং বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যাক্তি বাড়াবাড়ি করে, তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। হে বুদ্ধিমানগণ! কেসাসের মধ্যে তোমাদের জন্যে জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।”সুরা বাকারাহঃ ১৭৮-১৭৯।
“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যেঃ যা আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ করা হয়েছে আমরা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবর্তীণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা তাগুতকে অস্বীকার করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। আর যখন আপনি তাদেরকে বলবেন, আল্লাহর নির্দেশের দিকে এসো-যা তিনি রসূলের প্রতি নাযিল করেছেন, তখন আপনি মুনাফেকদিগকে দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণ ভাবে সরে যাচ্ছে।” সুরা আন-নিসাঃ ৬০-৬১।
“অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম! সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে (নবী সাঃ কে) ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হূষ্টচিত্তে তা কবুল করে নেবে”। সুরা আন-নিসাঃ ৬৫।
৩. কুরআন ও সুন্নাহ বাদ দিয়ে অন্যের বিধান দিয়ে বিচার ফায়সালা করাঃ আল্লাহ যা অবতীর্ন করেছেন (কুরআন+সুন্নাহ) তা বাদ দিয়ে যে বিচারক/শাসক বা নেতাগন অন্য আইন/বিধান/সংবিধান দিয়ে ফয়সালা করে। যেমন কুরান-হাদীস বিরোধী কোনো আইন রায়, কিয়াস, কারো ফতোয়া, অলিদের কথা, পীর মাশায়েখর কথা মানা, সংসদে আইন পাশ করে সমাজে চাপিয়ে দেয়া এবং বিজাতিদের মন গড়া সংবিধান মানা। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ “যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই কাফের”। সুরা আল-মায়িদাহঃ ৪৪।
৪. ইলমী গায়েব দাবী করাঃ যে “ইলমে গায়েব” বা অদৃশ্য জ্ঞানের দাবী করে সে তাগুত। এদের মাঝে রয়েছে জ্যোতিষী, গণক, রাশি-চক্র ইত্যাদি। যেমন আল্লাহ বলেনঃ “তাঁর কাছেই অদৃশ্য জগতের চাবি রয়েছে। এ গুলো তিনি ব্যতীত কেউ জানেনা। স্থলে ও জলে যা আছে, একমাত্র তিনিই জানেন। কোন পাতা ঝরে না, কিন্তু তিনি তা জানেন। কোন শস্য কণা মৃত্তিকার অন্ধকার অংশে পতিত হয় না এবং কোন আর্দ্র ও শুস্ক দ্রব্য পতিত হয় না, কিন্তু তা সব প্রকাশ্য গ্রন্থে রয়েছে”। সুরা আন-আমঃ ৫৯।
৫. আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করাঃ আল্লাহ ছড়া যার ইবাদত/পূজা/উপাসনা করা হয়, এবং এতে যে রাজী-খুশি থাকে সে তাগুত। এদের মাঝে রয়েছে সেইন্ট, ঠাকুর, পীর-ফকির, ধর্মীয় গুরু, নেতা ইত্যাদি যাদেরকে পূজা করা হয়। যেমন আল্লাহ বলেনঃ “তাদের মধ্যে যে বলে যে, তিনি (আল্লাহ) ব্যতীত আমিই উপাস্য, তাকে আমি জাহান্নামের শাস্তি দেব। আমি জালেমদেরকে এভাবেই প্রতিফল দিয়ে থাকি”। সুরা আল-আম্বিয়াঃ ২৯।
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আল্লাহ সুবহানুতালা আদম সন্তানের উপর প্রথম যে বিষয়টি ফরয করেছে তা হচ্ছে সকল প্রকার তাগুতকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখা। তাই তাগুতকে অস্বীকার করার ব্যাখ্যা হচ্ছে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারও বিধান তথা মানব রচিত বিধান পালন পরিহার করা আমাদের সকল আত্নসমর্পনকারী মুসলিমদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শুধু তাই নয়, সকল মুশরিকদের ঘৃণা করাই হচ্ছে ইবরা-হীমের সারমর্ম। যারা তা থেকে বিমুখ হয়েছে তারা নিজেদের বোকা বানিয়েছে। আল্লাহ সুবহানুতালা এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ إِلَّا قَوْلَ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ۖ رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ
ইবরাহীম ও তার সাথে যারা ছিল তাদের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। তারা যখন স্বীয় সম্প্রদায়কে বলছিল, ‘তোমাদের সাথে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যা কিছুর উপাসনা কর তা হতে আমরা সম্পর্কমুক্ত। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি; এবং উদ্রেক হল আমাদের- তোমাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য; যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আন। তবে স্বীয় পিতার প্রতি ইবরাহীমের উক্তিটি ব্যতিক্রম: ‘আমি অবশ্যই তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব আর তোমার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আমি কোন অধিকার রাখি না।’ হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপনার ওপরই ভরসা করি, আপনারই অভিমুখী হই আর প্রত্যাবর্তন তো আপনারই কাছে।
যে কোন ব্যক্তি বা দল চাই তা পুরুষ হোক কিংবা নারী, তা একক হোক কিংবা দল যদি তারা আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে অন্য কোন কিছুর আনুগত্য করে, কিংবা বিশ্বাস করে, তারা তাগুতের অনুসারী এবং যে বা যারা অন্যদেরকে সেই গায়রুল্লাহর আনুগত্য করতে বাধ্য করে সে বা তারা তাগুত।
ঈমান আনয়নের অপরিহার্য বিষয় হল তাগুতকে অস্বীকার করা। তাগুতের পরিচয় স্পষ্টভাবে জেনে তাগুতকে পরিহার করা ঈমানের দাবী। আর যদি তাগুতকে স্বীকার করে নেই, তার অনুসরণ করি এবং তার নিয়ম মেনে চলি, তাহলে আমরা আল্লাহর দরবারে নিকৃষ্টতম প্রমাণিত হব এবং সৎপথ থেকে সর্বাধিক বিচ্যুত হব।
সূরা নিসার ৬০ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন :
‘আপনি কি তাদের দেখেন নি যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি নাযিল হয়েছে, তারা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতিও বিশ্বাস করে। তারা বিচার ফয়সালাকে তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায় অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে যাতে তারা তাগুতকে অস্বীকার করে।‘
সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাগুতের পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আল্লাহ যথার্থভাবে বোঝার তাওফীক দিন।
তাগুত শব্দের আভিধানিক অর্থ
طَغٰى ক্রিয়াপদ। এর مَصْدَرٌ ক্রিয়ার মূল হলো طُغْيَانٌ আর طُغْيَانٌ শব্দের অর্থ সীমালংঘন। নদীর পানি প্রবাহ নদীর দুই তীর দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকাই নিয়ম। কিন্তু যখনই পানি তীরের সীমালংঘন করে উপচে উঠে দু’কুল ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তখনই একে আরবীতে বলা হয় طُغْيَانٌ অর্থাৎ পানি সীমালংঘন করেছে।
তদ্রুপ মানুষ কেবল আল্লাহরই ইবাদত করবে, তাঁরই প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তাঁরই আইন মেনে চলবে এটিই আল্লাহর দ্বীনে স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ আল্লাহর দ্বীনের এই স্বাভাবিক ব্যবস্থাকে ভাঙ্গে এবং অন্য শক্তি বা শক্তিসমূহকে অনুসরণ করে, বিশ্বাস করে তখনই সে সীমালংঘন করে।
আরবী ভাষায় সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য অভিধান ‘লিসানুল আরবী‘ গ্রন্থে তাগুত সম্পর্কে দীর্ঘ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে-
كُلُّ فُجَاوِذٍ حِدْرَةٌ فِىْ الْعِصْيَانِ طَاغٍ
অর্থাৎ যে বা যারা আনুগত্যের ক্ষেত্রে সীমালংঘন করে তারা তাগুত এবং যে কোন মানুষের ক্ষেত্রেই আল্লাহর আইন ভিন্ন অন্য কোন আইনের প্রণয়ন বা অনুসরণ তাগুত হওয়ার সীমানা।
তাগুত একটি পরিভাষা
আভিধানিক অর্থে তাগুত বলতে প্রত্যেক সীমালংঘনকারী ব্যক্তিকেই বুঝানো হয়। আল কোরআন ‘তাগুত’ কে নিজস্ব পরিভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে। কোরআনের পরিভাষায় ‘তাগুত’ পূর্ব অর্থসহ সেই বান্দা বা সেই শক্তিকে বলা হয় যা বন্দেগী বা দাসত্বের সীমালংঘন করে নিজেই প্রভু ও মনিব হওয়ার ভান করে, আল্লাহর বান্দাহদেরকে নিজের বন্দেগী করতে বাধ্য করে। একজন বান্দাহর আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার তিনটি স্তর রয়েছে।
১ম স্তর : মানুষ নীতিগতভাবে আল্লাহর আনুগত্য ও হুকুম পালনকেই সঠিক বলে বিশ্বাস করবে ও মানবে। কিন্তু কার্যত তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করবে। এই স্তরে অবস্থানের নাম ফিসক।
২য় স্তর : মানুষ নীতিগতভাবেই আল্লাহর আনুগত্য লংঘন করে স্বেচ্ছাধীন হবে অথবা আল্লাহ ছাড়া অপর কারো বন্দেগী করবে। একে বলা হয় কুফর।
৩য় স্তর : এ পর্যায়ে মানুষ প্রকৃত মালিক আল্লাহর প্রতি বিদ্রোহী হয়ে তাঁর রাজ্যে ও তারই প্রজা সাধারণের উপর নিজের আইন ও হুকুমত চালাতে শুরু করে।
যে ব্যক্তি এই চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয় তাকেই বলা হয় তাগুত।
সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন প্রকার তাগুত
সমগ্র কুরআনে ৫ প্রকার তাগুতের সন্ধান পাওয়া যায়।
১. নফস ও হাওয়া : نفس অর্থাৎ নাফস অর্থ প্রবৃত্তি আর হাওয়া অর্থ কু-প্রবৃত্তি। দেহের যাবতীয় দাবীকে একসাথে নাফস বলা হয়। যে দাবী মন্দ তাকেই হাওয়া বলে। দেহের ভাল ও মন্দের কোন ধারণা নেই। এ ধারণা আছে বিবেকের। রুহের সিদ্ধান্তই বিবেক। নাফস বা দেহের দাবি মন্দ বলেই ধরে নিতে হবে। বিবেক যাচাই করে .. দেয় কোন দাবিটা ভালো বা মন্দ। সূরা ইউসুফের ৫৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ
‘নিশ্চয়ই নাফস মন্দেরই হুকুম দেয়।‘ আল্লাহর নাফরমানীর জন্য তাগিদ দেয় বলেই নাফস তাগুত।
যদি কেউ সত্যিই আল্লাহর অনুগত বান্দাহ হতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই নাফসের কাফির হতে হবে। কেউ যদি উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে চায় তাহলে প্রথমেই তাকে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমি নফসের কথা মেনে চলব না; অর্থাৎ আমি বিবেকের বিরুদ্ধে চলবো না।
এ সিদ্ধান্ত না মেনে নিলে সে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা সত্তে¡ও নাফসের গোলামই থেকে যাবে। সে আল্লাহকে ইলাহ বা হুকুমকর্তা স্বীকার করা সত্তে¡ও নফস বা হাওয়াকে ইলাহ হিসেবেই মেনে চলবে।
সূরা জাছিয়ার ২৩ নং আয়াতে আছে-
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ
‘তুমি কি তাকে দেখেছ, যে তার কুপ্রবৃত্তিকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে?‘
কুরআনের অনুবাদে অনেকেই তাগুত অর্থ লিখেছেন শয়তান। শয়তান আল্লাহর নাফরমানী করার জন্য উসকে দেয় বলে শয়তান অবশ্যই তাগুত। কিন্তু তাগুত অর্থ শয়তান নয়।
শয়তান মানুষের নাফসকে বিভ্রান্ত করেই নাফরমানীর জন্য ওয়াসওয়াসা দেয়। তাই প্রথম নম্বর তাগুতের মধ্যেই শয়তান অন্তর্ভুক্ত।
২ শরীয়াত বিরোধী প্রচলিত কু-প্রথা ও সামাজিক কু-সংস্কার ও তাগুত
সূরা বাকারায় আল্লাহ বলেন-
‘যখন তাদেরকে বলা হলো যে, আল্লাহ যা (ওহী যোগে) নাযিল করেছেন তা মেনে চল, তখন তারা বলল, আমাদের বাপ-দাদাকে যা মেনে চলতে দেখেছি আমরা তাই মেনে চলব।‘ (সূরা বাকারা : ১৭০)
সমাজে বহু কুপ্রথা প্রচলিত যা শরীয়াত বিরোধী। ধর্মের নামেও বহু শরীয়াত বিরোধী প্রথা চালু আছে। বিয়ে- শাদিতে তো কুপ্রথার ব্যাপক প্রচলন আছে। কুপ্রথাগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। এসবকে অমান্য করতে গেলে বিরাট বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কুপ্রথাগুলো আইনের চেয়েও বেশি শক্শালী। আইন চালু করতে হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার(Law Enforcing Agency) প্রয়োজন হয়। কুপ্রথা নিজের শক্তি বলেই চালু থাকে। আইন করে ও তা দূর করা সহজ নয়।
এ কারণেই সামাজিক কুসংস্কারগুলো ও তাগুত। এ সবকে মানতে অস্বীকার না করলে ঈমানের দাবি পূরণ করা যায় না। এগুলো আল্লাহর হুকুমের বিরোধী। এ সবকে মেনে চললে আল্লাহকে অমান্য করা হয়।
৩. শাসন শক্তি : কারও উপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ যার আছে সেই হলো শাসন শক্তি। একটি দেশের সরকার হলো সবচেয়ে শক্তিশালী শাসন শক্তি। শাসন শক্তি বললে শুধু গভর্নমেন্টই বোঝায় না। স্বামী-স্ত্রীর সংসারে স্বামীও শাসন শক্তি। পরিবারের পিতা শাসন শক্তি। কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধানও শাসন শক্তি। কুরআনে ফিরাউন ও নমরুদকে শাসন শক্তি হিসেবে তাগুত বলা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) কে ফিরাউনের নিকট যাওয়ার আদেশ যে ভাষায় দিলেন, সেখানেও ফিরাউনকে সীমালংঘনকারী বলেই উল্লেখ করেছেন :
‘হে মুসা! ফিরাউনের নিকট যাও, নিশ্চয়ই সে সীমালংঘন করেছে।‘ (সূরা ত্বহা : ২৪)
৪. রিযিক বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখানোর শক্তি
এ প্রকার তাগুতটি শাসন শক্তিরই অন্তর্ভুক্ত। চাকরি থেকে সরিয়ে দিয়ে রিযিক বন্ধ করার ক্ষমতা যাদের আছে তারা শাসন শক্তি বটে। তবু এটা পৃথকভাবে গণ্য করার যোগ্য তাগুত। শাসন শক্তি প্রয়োগ করে অন্যায়ভাবে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দিতে পারে ও বিভিন্নভাবে ক্ষতি করতে পারে কিন্তু চাকরি থেকে বরখাস্ত শাস্তিটি চরম জুলুম বলেই রিযিক বন্ধ করার ভয় দেখানোর শক্তিকে শাসন শক্তি থেকে আলাদা ভাবে গণ্য করা হলো। এ শক্তি প্রয়োগ করে অধীনস্থদেরকে আল্লাহর নাফরমানী করতে বাধ্য করা যায় বলেই এটাও তাগুত।
৫. অন্ধভাবে মেনে চলার দাবিদার শক্তি তাগুত
সমাজে এমন কতক লোক আছে যারা তাদেরকে তাগুত ভাবে মেনে চলার জন্য নৈতিক প্রভাব প্রয়োগ করতে সক্ষম তাদের দাবি হলো, বিনা যুক্তিতে তাদের কথা মেনে চলতে হবে।
বিনা প্রশ্নে তাদের আনুগত্য করতে হবে। বিনা বাক্য ব্যয়ে তাদের হুকুম পালনের অধিকার তারা দাবি করে।
অথচ আল্লাহ ও রাসূল (সা.) ছাড়া এ দাবি করার আর কারো অধিকার নেই। যেহেতু আল্লাহ নির্ভুল এবং রাসূল (সা.) আল্লাহর ওহী দ্বারা পরিচালিত বলে তিনিও নির্ভুল, সেহেতু এ দু’সত্ত¡াকে বিনা দ্বিধায় শর্তহীনভাবে মেনে চলতে হবে। এছাড়া আর কারো এ জাতীয় আনুগত্যের দাবিদার হওয়ার অধিকার নেই। তাই যারা এ দাবি করে তারাও তাগুত।
সূরা তওবার ৩১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ
‘তারা তাদের ওলামা ও পীরদেরকে আল্লাহর বদলে তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।‘
মূর্তি, কবর, স্মৃতিস্তম্ভ বা কাল্পনিক কোন শক্তি, আলেম, মুজাহিদ, পন্ডিত, বুুদ্ধিজীবী, গণক, ভবিষ্যত বক্তা, নেতা-নেত্রী যাদেরকে কোরআন ও সুন্নাহর দেওয়া সীমানার বাইরে অনুসরণ করা হয়, যাদের কথা ও কাজকে কোরআন ও সুন্নাহর দলিলের মত মনে করা হয় তারাও তাগুত।
আল কুরআনে তাগুত সম্পর্কিত বক্তব্য

আল কুরআনে তাগুত সম্পর্কিত আলোচনা হয়েছে মোট ৮টি স্থানে।
১. দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই। প্রকৃত শুদ্ধ ও নির্ভুল কথা সুস্পষ্ট এবং ভুল চিন্তাধারা হতে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে গেছে। এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে সে এমন এক শক্তিশালী অবলম্বন ধরেছে, যা কখনই ছিঁড়ে যাবার নয় এবং আল্লাহ (যার আশ্রয় সে গ্রহণ করেছে) সবকিছু শ্রবণ করেন এবং সব কিছু জানেন। (সূরা বাকারা : ২৫৬)
২. যারা ঈমান আনে, তাদের সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক হচ্ছেন আল্লাহ: তিনি তাঁদেরকে অন্ধকার হতে আলোকের দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরী অবলম্বন করে, তাদের সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক তাগুত। উহা তাদেরকে আলো হতে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এরা হবে জাহান্নামী, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে।‘ (সূরা বাকারা : ২৫৭)
৩. হে নবী, তুমি কি সেইসব লোকদের দেখ নাই, যারা দাবী করে যে, আমরা ঈমান এনেছি সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার প্রতি নাযিল হয়েছে এবং যা তোমার পূর্বে নাযিল হয়েছিল, কিন্তু তারা নিজেদের যাবতীয় ব্যাপারে ফয়সালার জন্য তাগুতের নিকট পৌঁছতে চায়। অথচ তাগুতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার ও অমান্য করতে তাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছিল। মূলত শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সত্য সরল পথ হতে বহু দূরে নিয়ে যেতে চায়। তাদেরকে যখন বলা হয় যে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সেই দিকে আস এবং রাসূলের নীতি গ্রহণ কর, তখন এই মুনাফিকদের তুমি দেখতে পাবে যে তারা তোমার নিকট আসতে ইতস্ততঃ করছে এবং পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। (সূরা নিসা : ৬০)
৪. যারা ঈমানের পথ গ্রহণ করে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে আর যারা কুফরী পথ অবলম্বন করে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে।‘ (সূরা নিসা : ৭৬)
৫. তুমি কি সেই লোকদের দেখ নাই, যাদেরকে কিতাবের জ্ঞানের একাংশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের অবস্থা এই যে, তারা জিব্ত ও তাগুতকে মেনে চলছে এবং কাফেরদের সম্পর্কে বলে যে, ঈমানদার লোক অপেক্ষা এরাই তো সঠিক পথে চলছে। বস্তুত: এইসব লোকের উপরই আল্লাহ তাআলা লা’নত করেছেন, তারা কোন সাহায্যকারী পাবে না। (সূরা নিসা: ৫১)
৬. যারা তাগুতের দাসত্ব করা থেকে দূরে থাকে এবং আল্লাহর অভিমুখী হয় তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। (সূরা যুমার : ১৭)
৭. আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই নির্দেশ দেয়ার জন্য যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। (সূরা নাহল : ৩৬)
৮. বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি, কাদের জন্য মন্দ প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে? যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদের প্রতি তিনি ক্রোধানি¦ত হয়েছেন, যাদের কতককে বানরে ও শূকরে রূপান্তরিত করেছেন এবং যারা তাগুতের আরাধনা করেছে, তারাই মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর এবং সত্যপথ থেকে অনেক দূরে। (সূরা মায়েদা : ৬০)
আল কুরআন তাগুত সম্পর্কিত আয়াতসমূহ থেকে যে মূলনীতি ঘোষণা করেছে –
১. ঈমান আনার অপরিহার্য শর্ত তাগুতকে অস্বীকার করা।
২. কুফরী পথের সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক তাগুত।
৩. তাগুত আল্লাহর বান্দাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের পথে নিয়ে যায়।
৪. তাগুতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার ও অমান্য করার আদেশ দেওয়া হয়েছে তথাপি মানুষ বিচার ফয়সালার জন্য তাগুতের কাছে যেতে চায়।
৫. তাগুতের পথ অবলম্বনকারীরা আল্লাহর নাযিলকৃত পদ্ধতির এবং রাসূলের নীতির দিকে আহ্বান জানালে ইতস্ততঃ করে এবং পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
৬. ঈমানদার লড়াই করে আল্লাহর পথে আর কাফের লড়াই করে তাগুতের পথে।
৭. তাগুত অবলম্বনকারীরা বলে তারা ঈমানদারদের থেকে অধিকতর সঠিক পথে রয়েছে।
৮. তাগুত অবলম্বনকারীদের প্রতি আল্লাহ লা’নত বর্ষণ করেছেন। তারা কোন সাহায্যকারী পাবে না।
৯.আল্লাহর দাসত্ব করা এবং তাগুত থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা দেওয়ার জন্যই আল্লাহ রাসূল প্রেরণ করেছেন।
তাগুতের অনিষ্টকারিতা
‘হে মানবজাতি! তোমাদের প্রতি আল্লাহর যে অনুগ্রহ রয়েছে, তোমরা তা স্মরণ করো। আল্লাহ ছাড়া এমন কোন স্রষ্টা আছেন কি যিনি আসমান-জমীন থেকে তোমাদেরকে রিযিক দেন? তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তবু তোমরা কোথায় ছুটে বেড়াচ্ছ?‘ (সূরা আল ফাতির : ৩)
মানব সমাজে তাগুতের অনিষ্টকারিতা ভয়াবহ। মহান সত্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে সে সর্বোচ্চ যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তাতে সে শুধু সর্বোচ্চ শক্তিমান আল্লাহরই আনুগত্য করতে পারে। তার চেয়ে কম শক্তিশালী কোন সত্তার তথা তাগুতের আনুগত্য মানুষের মর্যাদাকে বিনষ্ট করে। তাগুতের ফলে মানুষ বিকৃত জীবনব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলশ্র‘তিতে পৃথিবী তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে হারিয়ে ফেলবে।
তাগুত সর্বদাই আল্লাহর দাসত্ব থেকে ফিরিয়ে রেখে আল্লাহ বিরোধী শক্তির দাসত্ব করতে বাধ্য করে। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করা অপরিহার্য।
তাওহীদের মৌলিক উপাদান (রুকন) তথা لا إله إلا لله ‘র মৌলিক উপাদান
রুকন হচ্ছে এমন বিষয়, যার অনুপস্থিতিতে অন্য একটি বিষয়ের অনুপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে উঠে। রুকন অবশ্যই মূল বিষয়টির অন্তর্গত হওয়া চাই। যেহেতু রুকন কোন জিনিসের আভ্যন্তরীণ বা ভেতরের বিষয়, সেহেতু শুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি এর উপর নির্ভরশীল। অতএব কোন জিনিসের রুকন ব্যতীত তা সহীহ বা শুদ্ধ হয় না। রুকন কি জিনিস, এটা জানার পর আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে যে, যে তাওহীদ আল্লাহ তায়ালা আপনার ওপর ওয়াজিব করে দিয়েছেন, সে তাওহীদেরও সালাতের মতোই রুকন আছে। সালাত যেমন তার রুকন যথা- তাকবীরে তাহরিমা, রকু, সেজদা, শেষ বৈঠক ইত্যাদি আদায় করা ব্যতীত শুদ্ধ হয় না, কোনো ব্যক্তি যদি সালাতের কোনো রুকন বাদ দেয় তাহলে তার সালাত যেমন ভাবে বাতিল হয়ে যায়, তেমনি ভাবে কোনো ব্যক্তি যদি তাওহীদের কোনো একটি রুকন বাদ দেয়, তাহলে সে ব্যক্তিও আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারবে না। এমতাবস্থায় কলেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ‘ তার কোনো কাজে আসবে না, সে আর মুসলিম থাকবে না বরং সে কাফেরে পরিণত হয়ে যাবে।

তাওহীদের দুটি রুকন (মৌলিক উপাদান) তাওহীদের প্রথম রুকন বা মৌলিক বিষয় হচ্ছে “কুফর বিত ত্বাগুত বা তাগুতকে অস্বীকার করা”। আর দ্বিতীয় রুকন বা মৌলিক বিষয় হচ্ছে “ঈমান বিল্লাহ বা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা”। এর প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার নিম্মোক্ত বানীঃ “যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করলো আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো, সে এমন এক শক্ত রজ্জু ধারণ করলো যা কখনো ছিড়ে যাবার নয়”। (আল-বাক্বারাহ ২: ২৫৬)

ﺎ ﻣ ﺑ ﻠ উপরোক্ত আয়াতের فمن يكفر الطاغوت হচেছ ১ম রোকন, ﺆن ﺑ ہ ل হচেছ ২য় রোকন এবং العروة الوثقى (শক্ত রজ্জু) বলতে কলেমা কে বুঝানো হয়েছে। আর এটাই মূলতঃ তাওহীদের কলেমা।

সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে রাসল (সঃ) ইরশাদ করেছেনঃ “যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললো আর আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল উপাস্যকে অস্বীকার করলো তার জান ও মাল পবিত্র “(অর্থাৎ কাফেরদের জান ও মালের মতো গনিমতের মাল নয়।) এবং তার হিসাবের ভার আল্লাহর ওপরই ন্যস্ত (অর্থাৎ মনের কুফরীর বিচার আল্লাহই করবেন।)

প্রথম রুকনঃ তাগুতকে অস্বীকার করা

প্রিয় পাঠক ! (আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথের দিশা দান করন) আপনাকে জেনে রাখতে হবে যে, তাগুতের কুফরী ব্যতীত একজন বান্দা কখনো “মুওয়াহ্যিদ” (আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী) হতে পারে না। আর তাগুত কি জিনিস তা জানা ব্যতীত, তাগুতকে অস্বীকার করা কখনো সম্ভব নয়।
তাগুত এর আভিধানিক সংজ্ঞাঃ তাগুত শব্দের অর্থ হচ্ছে সীমালংঘনকারী, আল্লাহদ্রোহী, বিপথে পরিচালনাকারী। তাগুত শব্দটি আরবী (তুগইয়ান) শব্দ থেকে উৎসারিত, যার অর্থ সীমালংঘন করা, বাড়াবাড়ি করা, স্বেচ্ছাচারিতা। শব্দের ক্রিয়ামূল (ত্বগা) এবং বহুবচন । যেমন পানির একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। নূহ (আঃ) এর সময় যখন জলোচ্ছাস হয়েছিল তখন পানি তার এ সীমা অতিক্রম করেছিল, এ ঘটনাকে কোরআনে এভাবে বলা হয়েছেঃ ‘‘যখন জ্বলোচ্ছাস হয়েছিল তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহন করিয়েছিলাম”। (সূরা, হাক্কা-৬৯:১১)

কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতায়ালা সাধারণ সীমালংঘন এবং সুনির্দিষ্ট সীমালংঘনের বর্ণনা দিতে ব্যবহার করেছেন। যেমন সাধারন সীমালংঘন অর্থে কোরআনে ক্রিয়াটি ব্যবহৃত হয়েছে-

كَلاَّ إِنَّ الإِْنسَانَ لَيَطْغَى অর্থাৎ “বস্তুত মানুষতো সীমালংঘন (لَيَطْغَى লা ইয়াতগা) করেই থাকে।” (সূরা, ‘আলাক- ৯৬:৬)

أَلاَّ تَطْغَوْا فِي الْمِيزَانِ “যাতে তোমরা সীমালংঘন (تَطْغَو লা তাতগা) না কর মানদন্ডে।” (সূরা, আর রাহমান-৫৫:৮)

সুনির্দিষ্ট সীমালংঘন অর্থে ক্রিয়াটি ব্যবহৃত হয়েছে (হালাল খাবার সম্পর্কে): “তোমাদিগকে আমি যা দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তুসমূহ খাও এবং সীমালংঘন করো না, তাহলে তোমাদের উপর আমার ক্রোধ নেমে আসবে এবং যার উপর আমার ক্রোধ নেমে আসবে সে ধ্বংস হয়ে যায়।” (সূরা, ত্ব-হাঃ ৮১)

যারা অবিশ্বাসী হয়ে সীমালংঘন করে আল্লাহ তাদের জন্যও এ ক্রিয়া ব্যবহার করেছেন। যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে রব এবং ইলাহ (ইবাদতের যোগ্য) হিসেবে গ্রহন করে সীমালংঘন করেছে কোরআনে সে কাফিরদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা (ত্বা-গি-ন) বলেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ “আর সীমালংঘনকারীদের (লিত ত্বাগিন) জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট পরিণাম।”(সূরা, ছোয়াদ-৩৮:৫৫) “প্রকাশ করা হবে জাহান্নাম, অনন্তর যে সীমালংঘন করে এবং পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেয়।” (সূরা, নাযিয়াত-৭৯: ৩৬-৩৮) অর্থাৎ “ছামুদ সম্প্রদায় অবাধ্যতায় (বি ত্বাগওয়াহা~) অস্বীকার করেছিল।” (সূরা, শামস-৯১:১১)

আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাগুতকে বর্জনের অপরিহার্যতা

প্রত্যেক ব্যক্তির এই জ্ঞান থাকা উচিৎ যে,সমস্ত জীব ও জড়ের সূচনা ও কর্তৃত্ব মহান আল্লাহর।

সালাত, যাকাত বা অন্যান্য ইবাদতের পূর্বে যে দৃঢ় ব্যাপার মহান আল্লাহ আদম (আঃ) এর সন্তানদের আদেশ করেছেন তা হল আল্লাহ তা’য়ালা একত্বের প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং অন্য সমস্ত উপাস্যগুলোকে (তাগুত) পরিত্যাগ ও অস্বীকার করা।
এর জন্যই আল্লাহ জীব সৃষ্টি করলেন, নবীদের প্রেরণ করলেন, আসমানী কিতাবগুলো নাযিল করলেন এবং আদেশ দিলেন জিহাদ ও শাহাদাতের। এর জন্যই মহান আল্লাহর বান্দা ও শয়তানের অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে শত্রুতা আর এর দ্বারাই মুসলিম জাতি ও সঠিক খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন এবং মানুষকে এইজন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে।” (সূরা-যারিয়াত: ৫৬) এর অর্থ একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করা। তিনি আরও বলেনঃ “আল্লাহর ইবাদত করিবার ও তাগুতকে বর্জন করবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি।” (সূরা-নাহল: ৩৬)

কোন ইলাহ নাই আল্লাহ ব্যতীত (আক্ষরিক কোন উপাস্য বা ইবাদতের যোগ্য কোন কিছু বা কেউ নাই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া), এই বিশ্বাস হচ্ছে ইসলামের মূল বা ভিত্তি। এই বিশ্বাসের অবর্তমানে কোন দাওয়া, জিহাদ, সালাত, সওম, যাকাত বা হজ্জ কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না। কোন ব্যক্তিকেই জাহান্নামের আগুন থেকে বাচাঁনো যাবে না যদি না সে এই ভিত্তির প্রতি ঈমান না এনে থাকে। কারণ এটাই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের প্রতি আদেশকৃত অলঙ্ঘনীয় ভিত্তি। এই ভিত্তির অবর্তমানে দ্বীন-ইসলামের অন্যান্য স্তম্ভগুলো কোন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন হতে নিরাপদে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ “—-যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে সে এমন এক মযবুত হাতল ধরবে যা কখনও ভাঙ্গবে না। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা-বাকারা:২৫৬)

মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ “যারা ত্বাগুতের ইবাদত হতে দূরে থাকে এবং আল্লাহর অভিমূখী হয়, তাদের জন্য আছে সুসংবাদ। অতএব সুসংবাদ দাও আমার বান্দাদেরকে।” (সূরা-যুমার:১৭) লক্ষ্য করুন কেমন করে আল্লাহ

তা’আলা তাঁর নিজের প্রতি ঈমান আনার পূর্বে সকল (মিথ্যা) উপাস্যদের অস্বীকার ও অবিশ্বাস করার কথা বলেছেন, যেমন তিনি ঈমান আনয়নের পূর্বে কুফরকে ত্যাগ করার কথা বলেছেন।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এই শব্দগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার একত্ববাদের আদেশ দিয়েছেন
যা কিনা ইসলামের এই মজবুত ভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতির দিকে লক্ষ্য আরোপ করে। অতএব, সকল (মিথ্যা) উপাস্যদের চরম মাত্রায় অস্বীকার করা ব্যতীত মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ট ঈমান পোষণ করা যায় না। তাগুতকে চেনার পর নিশ্চয়ই তাগুতকে অস্বীকার করার অপরিহার্যতা কি বুঝতে পারছেন। কারণ এটা অসম্ভব যে, কোন ব্যাপারে বিশ্বাস করা, যতক্ষন না এ বিশ্বাসের বিপরীত কিছুকে অস্বীকার ও অবিশ্বাস করা হয়। উদাহরণস্বরুপ কেউ যদি দাবী করে, ‘আমি এক ইলাহকে বিশ্বাস করি।’ অত:পর সে বলল, ‘আমি দুই ইলাহকে বিশ্বাস করি’। ঐ ব্যক্তির দ্বিতীয় উক্তি প্রথম স্বীকারোক্তিকে মিথ্যায় পরিণত করে বা অস্বীকার করে। কারণ দ্বিতীয় উক্তি প্রথম উক্তির সম্পূর্ণ বিপরীত। এর অর্থ হচ্ছে তার একটা দাবী মিথ্যা অথবা উভয়টিই মিথ্যা। এজন্যই ঐরকম উক্তি সত্যকে মিথ্যা এবং অগ্রহনযোগ্য করে দেয়। সুনিশ্চিত সত্য একটা ব্যাপারে দু‘টি বিপরীতমুখী দিক থাকতে পারে না, যা ঐ নিশ্চিত বিষয়কে অস্বীকার করে।

তাগুতকে অস্বীকার করা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের অনিবার্য দাবী। তাওহীদের প্রথম রুকনই হচ্ছে তাগুতকে অস্বীকার করা, সুতরাং তাগুতকে বর্জন না করলে আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবী হবে অর্থহীন। ঈমানের প্রথম স্তম্ভ আল্লাহকে বিশ্বাস করা এবং দৃঢ়ভাবে ঘোষনা দেয়া । প্রথম অংশ অস্বীকার করে দ্বিতীয় অংশ এর বিরোধী বা বিপরীত কোন কিছুকে।

নিচের আয়াতটি এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয় যে, ত্বাগুতকে মেনে নেয়া এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করার সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘য়ালা বলেনঃ অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক জাতির নিকট রাসুল প্রেরণ করেছি আল্লাহর ইবাদত করার এবং তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেবার জন্য।” (সূরা, নাহল-১৬:৩৬) সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করল না সে নবীদের মূল দাওয়াতকে অস্বীকার করল এবং মূলতঃ আল্লাহর ইবাদত করতে অস্বীকার করল। কারণ প্রত্যেক নবী তাদের কওমকে তাগুতের ইবাদতকে পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহবান জানিয়েছিলেন।
এখন কেউ যদি নিজেকে ঈমানদার দাবী করে তাকে অবশ্যই তাগুতকে বর্জন করতে হবে। কারণ যে কালেমার স্বীকৃতি দিয়ে সে ইসলামে এসেছে সে কলিমার প্রথমাংশ ঘোষণা করার মাধ্যমে যাবতীয় বাতিল মা‘বুদকে অর্থাৎ তাগুত বর্জনের দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছে এবং দ্বিতীয় অংশ ঘোষণার মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহকে ইলাহ হিসাবে মেনে নিয়েছে। সুতরাং তাগুতকে বর্জন না করলে ঈমানের দাবী মিথ্যা প্রমানিত হবে। যারা এই তাগুতদের মানে তারা আল্লাহকে মানতে পারে না, আর যারা আল্লাহকে মানে তারা তাগুতদের মানতে পারে না। তবে হ্যাঁ, এমন অনেক ব্যক্তি আছে আল্লাহকে মানে আবার তাগুতদেরকেও মানে, কিন্তু আসলে যে আল্লাহকে মানা হয় না এ বোধ তাদের নেই। আর বর্তমানে অধিকাংশ লোকদের অবস্থাই এরকম।
উদাহরণস্বরূপ, কোরআন মাজীদে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘য়ালা ঐ ব্যক্তির ঈমানের মূল্যহীনতার কথা বলেছেন যে ব্যক্তি নিজেকে ঈমানদার দাবী করে আবার তাগুতের কাছে বিচার-ফায়সালা চায়, আল্লাহ তা‘য়ালা বলেনঃ “আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি, যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি তারা ঈমান আনয়ন করেছে। তারা বিরোধপূর্ণ বিষয়কে ফয়সালার জন্য তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি তাকে (তাগুতকে) অমান্য করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (আন-নিসাঃ ৬০)
যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কিংবা আল্লাহর পাশাপাশি তাগুতের ইবাদত করে তাদের উপর আল্লাহর লানৎ বর্ষিত হবে। আল্লাহতা‘য়ালা বলেন- “তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, যারা মান্য করে প্রতিমা ও শয়তানকে এবং কাফেরদেরকে বলে যে, এরা মুসলমানদের তুলনায় অধিকতর সরল সঠিক পথে রয়েছে। এরা হলো সে সমস্ত লোক, যাদের উপর লা’নত করেছেন আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং। বস্তুতঃ আল্লাহ যার উপর লা’নত করেন তুমি তার কোন সাহায্যকারী খুঁজে পাবে না”। (সূরা নিসা ৪:৫১-৫২)

পূর্ববর্তী জাতি যারা তাগুতের ইবাদত করেছিল তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেনঃ “বলুনঃ আমি তোমাদেরকে বলি, তাদের মধ্যে কার মন্দ প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে? যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন, যাদের প্রতি তিনি ক্রোধাম্বিত হয়েছেন, যাদের কতককে বানর ও শুকরে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন এবং যারা শয়তানের আরাধনা করেছে, তারাই মর্যাদার দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর এবং সত্যপথ থেকেও অনেক দূরে।” (সূরা মায়েদাহ-৫:৬০)
আর যারা তাগুতের ইবাদতকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ তাদের সুসংবাদ প্রদান করেনঃ
“যারা শয়তানী শক্তির পূজা-অর্চনা থেকে দূরে থাকে এবং আল্লাহ অভিমুখী হয়, তাদের জন্যে রয়েছে সুসংবাদ। অতএব, সুসংবাদ দিন আমার বান্দাদেরকে।যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।” (সূরা যুমার ৩৯:১৭-১৮)
যারা তাগুতের ইবাদতকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ তাদের ওয়ালী হবেনঃ “যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে”। (সূরা বাকারা ২:২৫৭)
তাগুত শব্দের শর‘য়ী সংজ্ঞা
এখানে আমরা আলোচনা করব তাগুত শব্দের শার’য়ী অর্থ নিয়ে তা, এজন্য যে কোরআন-সু্ন্নাহয় যখন কোন শব্দ ব্যবহৃত হয় তখন তার একটা নির্দিষ্ট শার’য়ী অর্থ দাড়ায়। তাগুত শব্দটি আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত ওহী দ্বারা সাব্যস্ত, যা আক্বীদার সাথে সম্পৃক্ত। তাগুত’ এর ভাষাগত মূল (ত্বা-গি-ন) এর মত একই রকম মূল হলেও তাগুত হচ্ছে সীমালংঘনের সুনির্দিষ্ট ধরণ। সীমালংঘন করলেই ত্বাগুত হয়ে যায় না, যেমন আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন পবিত্র (হালাল) খাবার খাওয়ার জন্য এবং এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি বা সীমালংঘন না করার জন্য (সূরা, ত্ব-হা ২০:৮১)। এখন কেউ যদি হারাম খায় তাহলে সে ত্বাগুত হয়ে যাবে না, বরং সে অবাধ্য হবে। এরকম অন্যান্য পাপের ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ ধরনের পাপ বা সীমালংঘন কুফর, শিরক্, নিফাক্ পর্যন্ত পৌছতে পারে কিন্তু এ কারণে কেউ ত্বাগুত হয়ে যায় না। বরং ত্বাগুত হবে ঐ রকম সীমালংঘনের ক্ষেত্রে যখন কোন ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর সাথে শরীক্ করে। সুতরাং একথা সুস্পষ্ট, যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করে সে মুশরিক কিন্তু সে ত্বাগুত নয়। আল্লাহ তাকে ত্বা-গি-ন বলেছেন। আর তাগুত হচ্ছে সে যে নিজেকে (মিথ্যা) রব এবং ইলাহ (অর্থাৎ ইবাদতের যোগ্য) বানিয়ে নেয়। এজন্যই সব তাগুতেরা ত্বা-গি-ন কিন্তু সব ত্বা-গি-নেরা তাগুত নয়।
যে ব্যক্তি আল্লাহর অধিকার, গুনাবলী, কার্যাবলী ও সত্তার দাবীতে সীমালংঘন করে সে তাগুত। আল্লাহ ব্যতীত যে কেউ ইবাদত গ্রহন করে বা দাবী করে সে তাগুত এবং যে কেউ আল্লাহর গুনাবলী দাবী করে সেও ত্বাগুত। তাগুত হচেছ সেই ব্যক্তি যে নিজের প্রতি আল্লাহর কার্যাবলী বা গুনাবলী আরোপ করে। যেমন ফেরাউন আল্লাহ দ্রোহী হয়েছিল এবং সীমালংঘন করেছিল,আল্লাহ সার্বভৌমত্বের মালিক অথচ সে নিজে মিসরের সার্বভৌমত্ব দাবী করেছিল। সে লোকদেরকে জড়ো করে ভাষণ দিয়েছিল যা কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছেঃ “ফেরাউন তার জাতির উদ্দেশ্যে (এক) ভাষণ দিলো। সে বললো, মিশরের সার্বভৌমত্ব কি আমার নয়? তোমরা কি দেখছো না যে, এই নদীগুলো আমার (রাজত্বের) অধীনেই বয়ে চলছে——–।” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৫১)
আল্লাহতা‘য়ালা তাকে ‘ত্বাগা’ বলেছেন সূরা ত্বাহার ২৪ নং আয়াতে এবং মুসা (আঃ) কে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কাছে যাওয়ার জন্য- “ফেরাউনের নিকট যাও, সে তো সীমালংঘন করেছে।” শরীয়তের পরিভাষায়, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই তাগুত যে, আল্লাহদ্রোহী হয়েছে এবং সীমালংঘন করেছে, আর আল্লাহর কোনো হককে নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করেছে এবং এমন বিষয়ে নিজেকে আল্লাহর সাথে সমকক্ষ বানিয়েছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস।

সুস্পষ্ট ভাবে তাগুত এর অর্থ হচ্ছে, কোন মাখলুক (সৃষ্টি) নিন্মোক্ত তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি বিষয়কে (আল্লাহর স্থলে) নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করাঃ-কোন মাখলুক (সৃষ্টি) কর্তৃক আল্লাহতা‘য়ালার কার্যাবলীর যে কোন কার্য সম্পাদনের বিষয়টি নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা। যেমন সৃষ্টি করা, রিজিক দান অথবা শরীয়ত (বিধান) রচনা। এসব বিষয়গুলো সম্পাদনের ব্যাপারকে যে ব্যক্তি নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করবে (অর্থাৎ কেউ যদি বলে, আমি সৃষ্টি করি,আমি বিধান দেই) সেই তাগুত ।
কোন মাখলুক (সৃষ্টি) আল্লাহতা‘য়ালার কোন সিফাত বা গুন কে নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা। যেমন ইলমে গায়েব জানা। যদি কেউ তা করে (অর্থাৎ বলে আমি এলমে গায়েব জানি) তাহলে তাকে তাগুত হিসেবে গন্য করা হবে।
যে কোন ইবাদত মাখলুক কর্তৃক (বা সৃষ্টির) এর উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা । যেমনঃ দোয়া, মানত, নৈকট্য লাভের জন্য পশু জবাই অথবা বিচার ফায়সালা চাওয়া। যদি (কোন মাখলুক) এসব ইবাদত গ্রহন করে, দাবীকরে, আকাঙ্খা করে অথবা (নিজের জন্য) সম্পাদন করে, তাহলে সেই তাগুত।
এমনকি কেউ তার জন্য ইবাদত নিবেদন করলে যদি সে নীরব থাকে তাহলেও সে ত্বাগুত বলে গন্য হবে, যতক্ষন পর্যন্ত না সে নিজেকে এ থেকে পবিত্র ও মুক্ত করে নেয় এবং এ হক্ আল্লাহর একথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়।
উপরোক্ত যে তিনটি বিষয়ে আলোচনা করেছি, তার যে কোন একটি যদি কেউ নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে বা নিজের জন্য সম্পাদন করে তাহলে সে তাগুত হিসেবে গন্য এবং নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ করে নিল। ইমাম আত্ তাবারী (রহঃ) বলেন, “আল্লাহর দেয়া সীমালংঘনকারী মাত্রই তাগুত বলে চিহ্নিত, যার অধীনস্থ ব্যক্তিরা চাপের মুখে তার ইবাদত করে বা তাকে তোষামোদ করার জন্য বা তার আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য তার ইবাদত করে। এ (তাগুত) উপাস্যটি মানুষ কিংবা শয়তান বা মূর্তি অথবা অন্য যেকোন বস্তু হতে পারে।” (তাফসীরে তাবারী, ইফাবা/৫ম খন্ড, ২৫৬ নং আয়াতের তাফসীর)
সাইয়্যেদ আবুল আ‘লা মওদুদী তাহফীমুল কোরআনে সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতের তাফসীরে তাগুতের ব্যাখ্যায় বলেন, “আভিধানিক অর্থে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাগুত বলা হবে, যে নিজের বৈধ অধিকারের সীমালংঘন করেছে। কোরআনের পরিভাষায় তাগুত এমন এক বান্দাকে বলা হয়, যে বন্দেগী ও দাসত্বের সীমা অতিক্রম করে নিজেই প্রভূ এবং রব হবার দাবীদার সাজে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজেদের বন্দেগী এবং দাসত্বে নিযুক্ত করে। কোন ব্যক্তি এই তাগুতকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত কোন দিন সঠিক অর্থে আল্লাহর মু‘মিন বান্দা হতে পারে না।”
আল্লামা ড: মুহাম্মদ তকীউদ্দীন হেলালী ও আল্লামা ড: মুহাম্মদ মুহসিন খান কর্তৃক অনুদিত কুরআন মাজীদের ইংরেজী অনুবাদের সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতে উল্লেখিত ‘তাগুত’ শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে- “ The word ‘Taaghoot’ covers a wide range of meaning: it means everything worshipped other that Allah, i.e. all false deities. It may be satan, devils,idols, stones, sun, stars, human beings.” অর্থাৎ “তাগুত” শব্দটি বিস্তৃত অর্থ বোঝায়ঃ এটার অর্থ আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করা হয়। যেমন সকল মিথ্যা উপাস্য; এটা শয়তান, মৃত ব্যক্তির আত্মা, মুর্তি, পাথর, সূর্য, তারকা, অথবা কোন মানুষও হতে পারে। (The Noble Qur’an .English Translation , পৃষ্ঠা ৫৮)
সাইয়্যেদ কুতুব (রহ:) বলেন, “তাগুত বলতে সেইসব ব্যক্তি ও ব্যবস্থাকে বোঝায় যেগুলো ঐশী দ্বীন এবং নৈতিক, সামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলাকে অবমাননা করে এবং আল্লাহ নির্দেশিত বা তার দেয়া দিক-নির্দেশনা থেকে উদ্ভুত নয় এমন সব মূল্যবোধ ও রীতিনীতির ভিত্তিতে এই জীবন ব্যবস্থা পরিচালনা করে।” (তাফসীরে ফি যিলালিল কোরআন)
ইমাম মালেক (রহ:) তাগুতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেনঃ “এমন প্রত্যেক জিনিসকেই তাগুত বলা হয়, আল্লাহ তা‘য়ালাকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়।” (ফতহুল ক্বাদীর, আল্লামা শওক্বানী) এ সংজ্ঞাটি উত্তম এবং ব্যাপক অর্থজ্ঞাপক। আল্লাহ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয় সেই এ সংজ্ঞার অন্তর্ভূক্ত। যেসব উপাস্যকে ‘তাগুত’ হিসেবে গন্য করা হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ
মূর্তি, এমন সব কবর, গাছ, পাথর ও অচেতন পদার্থ যে গুলোর উপাসনা করা হয়;
আল্লাহর আইন ব্যাতীত এমন সব আইন যার মাধ্যমে বিচার ফায়সালা চাওয়া হয়;
এমনসব বিচারক তাগুতের অন্তর্ভূক্ত যারা আল্লাহর আইনের বিরোধী আইনদ্বারা মানুষের মধ্যে বিচার ফায়সালা করে;
শয়তান, যাদুকর, গনক (যারা ইলমে গায়েবের ব্যাপারে কথা বলে);
উপাস্য হতে যে রাজী;
যারা আইন রচনা বা মানুষের জন্য হালাল-হারাম নির্ধারণ করে কিংবা করার অধিকার রাখে বলে মনে করে;
প্রধান প্রধান তাগুত
তাগুতের সংখ্যা অনেক। তবে প্রধান-প্রধান তাগুত হলো পাঁচটি :
এক: শয়তান :
যে আল্লাহর ইবাদত থেকে মানুষকে অন্য কিছুর ইবাদতের দিকে আহবান করে।
এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী : “হে আদম-সন্তান, আমি কি তোমাদের থেকে শয়তানের ইবাদত না করার অঙ্গিকার নিই নি? নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” [সূরা ইয়াসিন: ৬০]
দুই: আল্লাহর আইন (হুকুম) পরিবর্তনকারী অত্যাচারী শাসক :
এর প্রমাণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আপনি কি তাদের দেখেন নি যারা মনে করে আপনার কাছে এবং আপনার পূর্ববর্তীদের কাছে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছে, তারা তাগুতকে বিচারক হিসাবে পেতে আকাঙ্ক্ষা করে অথচ তাদেরকে এর (তাগুতের) সাথে কুফরির নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আর শয়তান তাদেরকে সহজ সরল পথ থেকে অনেক দুর নিয়ে যেতে চায়।” [সূরা আন্‌নিসাঃ ৬০]
তিন : আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ (আইনের) হুকুমের বিপরীত হুকুম প্রদানকারী :
আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচার করে না তারা কাফের।” [সূরা আল মায়েদা: ৪৪]
চার : আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন গায়েবের খবর রাখার দাবিদার :
আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “তিনি গায়েবের জ্ঞানে জ্ঞানী, সুতরাং তার অদৃশ্য জ্ঞানকে কারও জন্য প্রকাশ করেন না, তবে যে রাসূল এর ব্যাপারে তিনি সন্তুষ্ট তিনি তাকে তার সম্মুখ ও পশ্চাৎ থেকে হিফাজত করেন।” [সূরা আল-জিন: ২৬, ২৭]
অন্য আয়াতে বলেন : “আর তার কাছেই সমস্ত অদৃষ্ট বস্তুর চাবিকাঠি, এগুলো তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না, তিনি জানেন যা ডাঙ্গায় আছে আর যা সমুদ্রে আছে। যে কোন (গাছের) পাতাই পতিত হয় তিনি তা জানেন, জমিনের অন্ধকারের কোন শস্য বা কোন শুষ্ক বা আর্দ্র বস্তু সবই এক প্রকাশ্য গ্রন্থে সন্নিবেশিত আছে।” [সূরা আল-আন‘আম: ৫৯]
পাঁচ : আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা হয় এবং সে এই ইবাদতে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট :
আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “আর তাদের থেকে যে বলবে- আল্লাহ ব্যতীত আমি উপাস্য, তাকে আমি জাহান্নাম দ্বারা পরিণাম ফল প্রদান করব, এভাবেই আমি অত্যাচারীদের পরিণাম ফল প্রদান করে থাকি”। [সূরা আল-আন্‌বিয়াঃ ২৯]
মনে রাখা দরকার কোন মানুষ তাগুতের উপর কুফরি ছাড়া ইমানদার হতে পারেনা, আল্লাহ বলেন :“সুতরাং যে তাগুতের সাথে কুফরি করে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনে সে এমন মজবুত রজ্জুকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে যার কোন বিভক্তি বা চিড় নেই, আর আল্লাহ সর্ব শ্রোতা ও সর্ব জ্ঞানী।” [সূরা আল-বাকারা: ২৫৬]
এ আয়াতের পূর্বাংশে আল্লাহ বলেছেন যে, “বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন পথ, ভ্রষ্ট-পথ থেকে স্পষ্ট হয়েছে”। ‘বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন পথ’ বলতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দীনকে, আর ‘ভ্রান্ত-পথ’ বলতে আবু জাহলের দীন, আর এর পরবর্তী আয়াতের ‘মজবুত রশি বা রজ্জু’ দ্বারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (বা আল্লাহ ছাড়া হক কোন উপাস্য নেই) এ সাক্ষ্য প্রদানকে বুঝিয়েছেন।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এ কলেমা কিছু জিনিসকে নিষেধ করে, এবং কিছু বস্তুকে সাব্যস্ত করে, সকল প্রকার ইবাদতকে আল্লাহর ছাড়া অন্যের জন্য হওয়া নিষেধ করে। শুধুমাত্র লা-শরীক আল্লাহর জন্য সকল প্রকার ইবাদতকে নির্দিষ্ট করে।
“আল্লাহর জন্যই সমস্ত শোকর, যার নেয়ামত ও অনুগ্রহেই যাবতীয় ভাল কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে।”
সর্বপরি বলা যায় যে, আল্লাহ সুবহানুতালা আমাদের সকলকে আল্লাহর হুকুম বিধান সঠিকভাবে পালন করার তৌফিক দান করুন আর সকল প্রকার তাগুত থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন, আমীন।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ, জিয়া পরিষদের সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক,সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম আহবায়ক, জাতীয়তাবাদী গবেষনা পরিষদের সিনিয়র সহ সভাপতি, শের-ই-বাংলা রিসার্চ ইনষ্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা, এবং চার্টাড ইনস্টিটিউট অব লিগ্যাল এক্সিকিউটিভের মেম্বার।

http://www.amardeshonline.com/pages/details/2015/07/12/292221#.VxMxajFbKyB

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s