নামাজে রাফ‘উল ইয়াদায়েন সম্পর্কে একটি তাত্ত্বিক আলোচনা

 kl

 নামাজে রাফ‘উল ইয়াদায়েন সম্পর্কে একটি তাত্ত্বিক আলোচনা ( ﺭﻓﻊ ﺍﻟﻴﺪﻳﻦ )

রাফ উল ইয়াদায়েন-এর অর্থ- দু’হাত উঁচু করা। এটি আল্লাহর নিকটে আত্মসমর্পণের অন্যতম নিদর্শন। (১)
রুকূ থেকে উঠে ক্বওমাতে দাঁড়িয়ে দু’হাত ক্বিবলামুখী স্বাভাবিকভাবে কাঁধ বা কান বরাবর উঁচু করে তিন বা চার রাক‘আত বিশিষ্ট ছালাতে মোট চারস্থানে ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ করতে হয়।
(১) তাকবীরে তাহরীমার সময়
(২) রুকূতে যাওয়ার সময়
(৩) রুকূ থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াবার সময় এবং
(৪) ৩য় রাক‘আতে দাঁড়িয়ে বুকে হাত বাঁধার সময়। এমনিভাবে প্রতি তাশাহ্হুদের বৈঠকের পর উঠে দাঁড়াবার সময় রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতে হয়।
রুকূতে যাওয়া ও রুকূ হ’তে ওঠার সময় ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ করা সম্পর্কে চার খলীফা সহ প্রায় ২৫ জন ছাহাবী থেকে বর্ণিত ছহীহ হাদীছ সমূহ রয়েছে। একটি হিসাব মতে ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’-এর হাদীছের রাবী সংখ্যা ‘আশারায়ে মুবাশ্শারা সহ (২)অন্যূন ৫০ জন ছাহাবী(৩) এবং সর্বমোট ছহীহ হাদীছ ও আছারের সংখ্যা অন্যূন চার শত। (৪) ইমাম সুয়ূত্বী ও আলবানী প্রমুখ বিদ্বানগণ ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ -এর হাদীছকে ‘মুতাওয়াতির’ (যা ব্যাপকভাবে ও অবিরত ধারায় বর্ণিত) পর্যায়ের বলে মন্তব্য করেছেন।(৫)
রাফ‘উল ইয়াদায়েন সম্পর্কে প্রসিদ্ধতম হাদীছ সমূহের কয়েকটি নিম্নরূপঃ
(১) আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন,
ﺃَﻥَّ ﺭَﺳُﻮْﻝَ ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﺮْﻓَﻊُ ﻳَﺪَﻳْﻪِ ﺣَﺬْﻭَ ﻣَﻨْﻜَﺒَﻴْﻪِ ﺇِﺫَﺍ ﺍﻓْﺘَﺘَﺢَ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓَ ﻭَﺇِﺫَﺍ ﻛَﺒَّﺮَ ﻟِﻠﺮُّﻛُﻮْﻉِ ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺭَﻓَﻊَ ﺭَﺃْﺳَﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺮُّﻛُﻮْﻉِ … ﻣُﺘَّﻔَﻖٌ ﻋَﻠَﻴْﻪِ، ﻭﻓﻲ ﺭِﻭَﺍﻳﺔٍ ﻋﻨﻪ : ﻭَ ﺇِﺫَﺍ ﻗَﺎﻡَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺮَّﻛْﻌَﺘَﻴْﻦِ ﺭَﻓَﻊَ ﻳَﺪَﻳْﻪِ …. ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱُّ –
‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছালাতের শুরুতে, রুকূতে যাওয়াকালীন ও রুকূ হ’তে ওঠাকালীন সময়ে….. এবং ২য় রাক‘আত থেকে উঠে দাঁড়াবার সময় ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ করতেন’। (৬) হাদীছটি বায়হাক্বীতে বর্ধিতভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, ﻓََﻤَﺎ ﺯَﺍﻟَﺖْ ﺗِﻠْﻚَ ﺻَﻼَﺗُﻪُ ﺣَﺘَّﻲ ﻟَﻘِﻲَ ﺍﻟﻠﻪَ ﺗَﻌَﺎﻟَﻲ – ‘এভাবেই তাঁর ছালাত জারি ছিল, যতদিন না তিনি আল্লাহর সাথে মিলিত হন’। অর্থাৎ আমৃত্যু তিনি রাফ‘উল ইয়াদায়েন সহ ছালাত আদায় করেছেন। ইমাম বুখারীর উস্তাদ আলী ইবনুল মাদ্বীনী বলেন, এই হাদীছ আমার নিকটে সমস্ত উম্মতের উপরে ‘হুজ্জাত’ বা দলীল স্বরূপ ( ﺣُﺠَّﺔٌ ﻋَﻠَﻲ ﺍﻟْﺨَﻠْﻖِ )। যে ব্যক্তি এটা শুনবে, তার উপরেই এটার আমল করতে হবে। হাসান বছরী ও হামীদ বিন হেলাল বলেন, সকল ছাহাবী উক্ত তিন স্থানে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন’। [৭]
(২) মালিক ইবনুল হুওয়াইরিছ (রাঃ) বলেন,
ﺃَﻥَّ ﺭَﺳُﻮْﻝَ ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥَ ﺇِﺫَﺍ ﻛَﺒَّﺮَ ﺭَﻓَﻊَ ﻳَﺪَﻳْﻪِ ﺣَﺘَّﻰ ﻳُﺤَﺎﺫِﻱَ ﺑِﻬِﻤَﺎ ﺃُﺫُﻧَﻴْﻪِ، ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺭَﻛَﻊَ ﺭَﻓَﻊَ ﻳَﺪَﻳْﻪِ ﺣَﺘَّﻰ ﻳُﺤَﺎﺫِﻱَ ﺑِﻬِﻤَﺎ ﺃُﺫُﻧَﻴْﻪِ، ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺭَﻓَﻊَ ﺭَﺃْﺳَﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺮُّﻛُﻮْﻉِ ﻓَﻘَﺎﻝَ ﺳَﻤِﻊَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻟِﻤَﻦْ ﺣَﻤِﺪَﻩُ ﻓَﻌَﻞَ ﻣِﺜْﻞَ ﺫَﻟِﻚَ، ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢٌ –
‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন ছালাতের জন্য ‘তাকবীরে তাহরীমা’ দিতেন, তখন হাত দু’টি স্বীয় দুই কান পর্যন্ত উঠাতেন। অতঃপর রুকূতে যাওয়ার সময় ও রুকূ হ’তে উঠার সময় তিনি অনুরূপ করতেন এবং ‘সামি‘আল্লা-হু লিমান হামিদাহ’ বলতেন’।[৮]
উল্লেখ্য যে, বহু ছহীহ হাদীছের বিপরীতে তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত বাকী সময়ে ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ না করার পক্ষে প্রধানতঃ যে হাদীছ পেশ করা হয়ে থাকে, তন্মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ (রাঃ) বর্ণিত হাদীছটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। যেমন আলক্বামা বলেন যে, একদা ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) আমাদেরকে বলেন,
ﺃَﻻَ ﺃُﺻَﻠِّﻲْ ﺑِﻜُﻢْ ﺻَﻼَﺓَ ﺭَﺳُﻮْﻝِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ؟ ﻓَﺼَﻠَّﻰ ﻭَﻟَﻢْ ﻳَﺮْﻓَﻊْ ﻳَﺪَﻳْﻪِ ﺇِﻻَّ ﻣَﺮَّﺓً ﻭَﺍﺣِﺪَﺓً ﻣَﻊَ ﺗَﻜْﺒِﻴْﺮَﺓِ ﺍﻟْﺎِﻓْﺘِﺘَﺎﺡِ، ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻯُّ ﻭﺍﺑﻮﺩﺍﺅﺩَ –
‘আমি কি তোমাদের নিকটে রাসূল (ছাঃ)-এর ছালাত আদায় করব না? এই বলে তিনি ছালাত আদায় করেন। কিন্তু তাকবীরে তাহরীমার সময় একবার ব্যতীত অন্য সময় আর রাফ‘উল ইয়াদায়েন করলেন না’।[৯]
শায়খ আলবানী বলেন, হাদীছটিকে ছহীহ মেনে নিলেও তা ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ -এর পক্ষে বর্ণিত ছহীহ হাদীছ সমূহের বিপরীতে পেশ করা যাবে না। কেননা ﻷﻧﻪ ﻧﺎﻑٍ ﻭﺗﻠﻚ ﻣُﺜْﺒِﺘَﺔٌ ﻭﻣﻦ ﺍﻟﻤﻘﺮَّﺭ ﻓﻲ ﻋﻠﻢ ﺍﻷﺻﻮﻝ ﺃﻥ ﺍﻟﻤﺜﺒﺖَ ﻣﻘﺪَّﻡٌ ﻋﻠﻲ ﺍﻟﻨﺎﻓﻲ – ‘এটি না-বোধক এবং ঐগুলি হাঁ-বোধক। ইলমে হাদীছ-এর মূলনীতি অনুযায়ী হাঁ-বোধক হাদীছ না-বোধক হাদীছের উপর অগ্রাধিকার যোগ্য’।[১০]
শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী বলেন, ﻭَﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻳَﺮْﻓَﻊُ ﺃَﺣَﺐُّ ﺇِﻟَﻲَّ ﻣِﻤَّﻦْ ﻻَّ ﻳَﺮْﻓَﻊُ ، ﻓَﺈِﻥَّ ﺃَﺣَﺎﺩِﻳْﺚَ ﺍﻟﺮَّﻓْﻊِ ﺃَﻛْﺜَﺮُ ﻭَﺃَﺛْﺒَﺖُ – ‘যে মুছল্লী রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে, ঐ মুছল্লী আমার নিকট অধিক প্রিয় ঐ মুছল্লীর চাইতে, যে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে না। কেননা রাফ‘উল ইয়াদায়েন-এর হাদীছ সংখ্যায় বেশী ও অধিকতর মযবুত’।[১১]
—————————————
[১] . নায়লুল আওত্বার ৩/১৯ পৃঃ।
[২] . ‘আশারায়ে মুবাশ্শারাহ’ অর্থাৎ স্ব স্ব জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন দশজন ছাহাবী। তাঁরা হলেন : ১.আবুবকর ছিদ্দীক্ব ‘আব্দুল্লাহ বিন ‘উছমান আবু কুহাফা (মৃঃ ১৩ হিঃ বয়স ৬৩ বৎসর)। ২. ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (মৃঃ ২৩ হিঃ বয়স ৬০) ৩. ‘উছমান ইবনু ‘আফফান (মৃঃ ৩৫ হিঃ বয়স অন্যূন ৮৩) ৪. ‘আলী ইবনু আবী ত্বালিব (মৃঃ ৪০ হিঃ বয়স ৬০) ৫. আবু ‘উবায়দাহ ‘আমের বিন ‘আব্দুল্লাহ ইবনুল জাররাহ (মৃঃ ১৮ হিঃ বয়স ৫৮) ৬. ‘আব্দুর রহমান বিন ‘আওফ (মৃঃ ৩২ হিঃ বয়স ৭৫) ৭. ত্বাল্হা বিন ‘উবায়দুল্লাহ (মৃঃ ৩৬ হিঃ বয়স ৬২) ৮. যোবায়ের ইবনুল ‘আওয়াম (মৃঃ ৩৬ হিঃ বয়স ৭৫) ৯. সা‘ঈদ বিন যায়েদ বিন ‘আমর (মৃঃ ৫১ হিঃ বয়স ৭১) ১০. সা‘দ বিন আবী ওয়াক্ক্বাছ (মৃঃ ৫৫ হিঃ বয়স ৮২) রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহুম।
[৩] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১০৭ পৃঃ ; ফাৎহুল বারী ২/২৫৮ পৃঃ, হা/৭৩৭-এর ব্যাখ্যা, ‘আযান’ অধ্যায়-১০, অনুচ্ছেদ-৮৪।
[৪] . মাজদুদ্দীন ফীরোযাবাদী (৭২৯-৮১৭ হিঃ), সিফরুস সা‘আদাত (লাহোর : ১৩০২ হিঃ, ফার্সী থেকে উর্দূ), ১৫ পৃঃ।
[৫] . তুহফাতুল আহওয়াযী ২/১০০, ১০৬ পৃঃ; আলবানী, ছিফাতু ছালা-তিন্নবী পৃঃ ১০৯।
[৬] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, বুখারী, মিশকাত হা/৭৯৩-৯৪ ‘ছালাতের বিবরণ’ অনুচ্ছেদ-১০। [৭] . বায়হাক্বী, মা‘রিফাতুস সুনান ওয়াল আছার হা/৮১৩, ‘মুরসাল হাসান’ ২/৪৭২ পৃঃ; মুওয়াত্ত্বা মালেক ‘ছালাত শুরু’ অনুচ্ছেদ; ‘মুরসাল ছহীহ’, মিশকাত হা/৮০৮; নায়লুল আওত্বার ৩/১২-১৩; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১০৮।
[৮] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৮০৯, ‘ছালাতের বিবরণ’ অনুচ্ছেদ-১০। [৯] . নায়লুল আওত্বার ৩/১৪ পৃঃ; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১০৮।
[১০] . মিশকাত হা/৮০৯-এর টীকা (আলবানী) ১/২৫৪ পৃঃ।
[১১] . হুজ্জাতুল্লা-হিল বালিগাহ ২/১০ পৃঃ।

তোমরা সালাত সমূহের ব্যাপারে যত্নবান হও

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s