দাড়ি রাখা ওয়াজিব না সুন্নত?

দাড়ি রাখা ওয়াজিব না সুন্নত?

মাঝে মাঝে খুব কাছের কিছু মানুষ ইসলামের খুটিনাটি কিছু বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করেন। তাদের এই জিজ্ঞাসার জবাব দিতে গিয়ে আমাকে পড়াশুনা করতে হয়।

এতে আমারও কিছু বিষয় সম্পর্কে জানা হয়ে যায়। আমি এজন্য তাদের কাছে ঋণি।

ইদানিং একটি প্রশ্ন আমার কাছে বেশি এসেছে তা হলো, দাড়ি রাখা ফরজ?ওয়াজিব? নাকি সুন্নত? এই প্রশ্নের উত্তরেই আজকের বিষয়ের অবতারণা।

প্রথমত, দাড়ি রাখা ফরজ না ওয়াজিব না সুন্নত এই সম্পর্কে কোনো উত্তর দেওয়া সিদ্ধান্তের নামান্তর। কোরআন হাদিসের আলোকে যারা সিদ্ধান্ত দেন আমি সে মাপের নই তাই আমার উত্তরটা সিদ্ধান্ত নয় বরং কেন দাড়ি রাখা উচিত সে সম্পর্কে কিছু যুক্তি ও প্রমাণের সাহায্যে দাড়ি রাখার যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করছি।

পবিত্র কোরআন একটি জীবন বিধান।মহান আল্লাহর বানী। অপরিবর্তনীয় এবং কোন প্রশ্ন ছাড়া মান্য। অর্থাৎ ফরজ।

আল্লাহর হাবীব মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম যা করেছেন, বলেছেন তাই করণীয়। আর যা বলেননি, করেননি তাই বর্জনীয়। অর্থাৎ এটা হাদিস।

কোরআন হাদিসের বাইরে মানব বিবেক খাটানো কুফরি বা কাফেরের কাজ।অর্থাৎ এখানে মানব বিবেকের কোন মত দেবার সুযোগ নেই।ঈমাম বোখারী (র.) প্রমাণ করেছেন,ইসলামের বিধান শরীয়ত মতে হযরত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে অসাল্লামের নিষেধাবলী হারাম হওয়া অর্থে এবং আদেশাবলী ফরজ ওয়াজিব হওয়া অর্থে পরিগণিত হবে।অবশ্য যদি সেই অর্থ উদ্দেশ্য না হওয়ার অন্য কোনো দলিল পাওয়া যায় তবে তা স্বতন্ত্র কথা।

সেই হিসেবে প্রথমেই পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহর একটি নিদর্শন যা তাঁর খালেস বান্দাদের জন্য প্রযোজ্য। যারা কোরআনের কথা বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়ে মহান আল্লাহর প্রিয়পাত্র তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন “এটা সেই কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই-মুত্তাকীদের পথ প্রদর্শক।যারা গায়েবে বিশ্বাস করে,ঠিকভাবে নামায পড়ে ও তাদের যে রিজেক দিয়েছি তা হতে খরচ করে।যারা বিশ্বাস করে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করেছি তার প্রতি এবং যারা পরকালের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।উহারাই স্বীয় রবের প্রদর্শিত পথে অবস্থিত এবং উহারাই পাবে মুক্তি। “ সুরা বাকারা,আয়াত-২-৫।

আর যারা কোরআনের অনুসারী তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে মহানবী নিশ্চয়তা দিয়েছেন।তারা যে শেষ বিচারের দিনে নিরাপদ এবং সহজ সরল বক্রতা মুক্ত পথে অবস্থিত সে কথা ও বলেছেন।

ইবন আব্বাস(রঃ) হতে বর্ণিত,হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে অসাল্লাম বলেছেন,যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব অনুসরন করে চলে,আল্লাহ্‌ তায়ালা তাকে গোমরাহী হতে বাঁচিয়ে সত্যপথে আনয়ন করেন এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাকে হিসাব নিকাসের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত রাখবেন।ইবন কাছির,১ম খণ্ড-পৃষ্ঠা-১৫৩।

হারিছুল আওয়ার(রঃ) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন, একদিন মসজিদে গিয়ে দেখি লোকজন হাদিস নিয়ে তর্ক বিতর্ক করছে।তখন আমি আলী(রঃ) এর কাছে গিয়ে বললাম,হে আমিরুল মুমিনীন!আপনি কি দেখেন না যে,লোকেরা হাদিস নিয়ে তর্ক বিতর্ক করছে?তিনি প্রস্ন করলেন তারা কি সত্যিই তা করেছে?আমি বললাম- হ্যাঁ।তিনি বললেন,নিশ্চয় আমি হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে অসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে,শীঘ্রই ফিতনা দেখা দিবে।আমি প্রস্ন করলাম,হে আল্লাহর রাসুল!উহা হতে বাঁচার উপায় কি? তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাব।এতে তোমাদের অতীত ও ভবিষ্যতের সব খবরাখবর বিদ্যমান।এটা তোমাদের চূড়ান্ত বিধান।এটা কোন তামাশার বস্তু নয়।যে দাম্ভিক এটা বর্জন করবে, আল্লাহ তাকে চূর্ণ করবেন। এটার বাইরে যে ব্যক্তি হিদায়েত খুঁজবে আল্লাহ্‌ তাকে বিভ্রান্ত করবেন।এটা আল্লাহর মজবুত রশি। এটা বিজ্ঞতম উপদেশগ্রন্থ। এটাই সিরাতুল মুস্তাকিম। এটা মানুষের খেয়াল খুশির নিয়ন্ত্রক। ভাষার বিভিন্নতাও এতে বিভিন্নতা সৃষ্টি করতে পারে না। আলিমগণের কোনোদিনই এটার চাহিদা মিটবে না। হাজার চ্যালেঞ্জ দিয়ে ও এটা সৃষ্টি করা যাবে না। আর এটার বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যে ও কোনো ঘাটতি দেখা দিবে না। সেই বৈশিষ্টের দূর্বার আকর্ষন জিনকে পর্যন্ত আকৃষ্ট করেছে। ফলে তারা বলতে বাধ্য হল-নিশ্চয় আমরা আশ্চর্য এক কোরআন শ্রবণ করেছি।উহা সঠিক পথের নির্দেশ দেয়। তাই আমরা ঈমান এনেছি।(সুরা জিন)।

তাই যে উহার আলোকে কথা বলে; সত্য বলে। আর যে উহা আমল করে সে পূণ্যলাভ করে। উহার ভিত্তিতে যে রায় দেয় সে ইনসাফ করে। আর যে উহার দিকে ডাকে সে সিরাতুল মুস্তাকিমের দিকেই ডাকে। হে আওয়ার উহা মজবুত করে ধারণ করো। ইবন কাছির, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৪।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে অসাল্লাম কর্তৃক কোরআনের ধারকদের মর্যাদা বর্ণনার পরে মহান আল্লাহ্‌ কি বলেছেন পবিত্র কোরআনে? মহান আল্লাহ্‌ বলেন, যে কেহ বিধান অমান্য করবে ব্যর্থ হয়ে যাবে তার নেক ও পরকালে সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে। (সুরা মায়িদা, আয়াত-৫)।

অর্থাৎ যে কেউ কোরআনের বিধান অমান্য করবে তার নেক আমল নষ্ট হয়ে যাবে এবং শেষ বিচারে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে। এটা মহান আল্লাহর একক সিদ্ধান্ত ও তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।

এছাড়াও মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে অসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহ্‌কে নিজের রব, ইসলামকে নিজের দ্বীন এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামকে রাসুল হিসেবে মেনে নিয়েছে সে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করেছে। আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব (র.) হতে বর্ণিত মুসলিম শরীফ, প্রথম খণ্ড, হাদিস নম্বর-৫৯।

উপরোক্ত আলচনা থেকে এই কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় কোরআনের আদেশ নিষেধ অবশ্যই মান্য। সেই সূত্রে পবিত্র কোরআনের বানী- হে আহলে কিতাব!নিঃসন্দেহে তোমাদের নিকট আমার রাসুল এসেছে। সে তোমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে সত্য প্রকাশ করছে, অন্যান্য রাসুলের আগমন ধারা বিচ্ছিন্ন থাকার পর যদি তোমরা বল যে, আমাদের নিকট কোনো সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী আসে নি; অনন্তর অবশ্যই তোমাদের নিকট সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। সুরা মায়িদা,আয়াত-১৯।

এখানে মহান আল্লাহ্‌ বলেছেন, অবশ্যই রাসুল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। তাঁর মর্যাদা ও গুরুত্ব বোঝাতে মহান আল্লাহ্‌ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, আর যখন আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে আদেশ প্রদান করেন, কোনো মুসলমান পুরুষ ও নারীর ওই কাজে কোনো অধিকার থাকে না। যে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের আদেশ পালন করবে না সে প্রকাশ্যভাবে পথভ্রষ্ট হবে। (সুরা আহজাব, আয়াত-৩৬)

অর্থাৎ আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে মত দিলে কোনো মুসলমান নারী বা পুরুষের ওই কাজে কোনো মত থাকবে না। আর যদি কারো মত থাকে তবে সে অবশ্যই ভ্রান্ত। সেজন্যই ভ্রান্তদের দলে না থেকে দাড়ি রেখে মহানবীর আদর্শ অনুসরণ করা আবশ্যক। (অন্তত উপরের আলচনা থেকে আমি নিশ্চিত এই ব্যাপারে। আমার বিবেচনা যদি ভুল হয় তবে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই)। এখানে কি দাড়ি রাখা ফরজ বা ওয়াজিব বা সুন্নত এই ব্যাপারে আলোচনার কোনো অবকাশ রয়েছে?

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মোচ ভালোরূপে কেটে ফেল ও দাড়ি ঝুলিয়ে রাখ। অগ্নিপূজকদের রীতি বর্জন করে চল। মুসলিম শরীফ।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের দাড়ি বড় করতে ও মোচ যথাসম্ভব কেটে ফেলতে বলেছেন বলে আব্দুল্লাহ ইবন ওমরের (রা.) বর্ণনায় রয়েছে।-(বোখারী শরীফ, ষষ্ট খণ্ড, হাদিস নম্বর-২২৬৭)।

এই হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবী ইবন ওমর (রা.) যখন হজ বা ওমরা সমাপ্ত করতেন তখন চুল কাটার সঙ্গে দাড়ি মুষ্টিবদ্ধ করে মুষ্টির নিচে যা অতিরিক্ত থাকতো তা কেটে ফেলতেন।

আসুন, দাড়ি রাখবো কি রাখবো না এই ব্যাপারে আর সন্দেহে না থেকে দাড়ি রেখে অন্তত একটি হাদিসের শ্রবণকারী ও মান্যকারী হিসেবে এই পাপী ও ফিতনা সংকুল জীবনের অবসান ঘটাই। তাহলে হয়তো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর হাবীবের সুপারিশ আমাদের নসীব হবো। না হলে আমরা শেষ বিচারের দিন অস্বীকারকারী সাব্যস্ত হবো। একটু ভেবে দেখি আল্লাহর রাসুল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলার পরও আমরা কোনো কাজ করলাম না তা কি ক্ষমার যোগ্য বা তা পালনে কি কোনো সন্দেহ থাকা উচিত?

কারণ আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অস্বীকারকারী ব্যতিত আমার উম্মতের সকলেই বেহেস্তে যেতে পারবে। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, অস্বীকারকারী কে? আল্লাহর হাবীব উত্তরে বললেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য অবলম্বন করে চলবে সে বেহেস্তে যাবে আর যে ব্যক্তি আমার নাফরমানী করবে সে অস্বীকারকারী সাব্যস্ত হবে। (বোখারী শরীফ, ৭ম খণ্ড, হাদিস নম্বর-২৬৯০)। আমীন।

সূত্র: মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

– See more at: http://www.banglanews24.com/beta/fullnews/bn/279599.html#sthash.2wnlx0bf.dpuf

http://gamsetech.com/?p=17

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s